আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী হোসেইনী খামেনেয়ী ১৯৩৯ সালের ১৬ জুলাই ইরানের মশহদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ‘সৈয়দ’ খেতাব বহন করেন, যা সরাসরি ইমাম আলী ইবনে আবু তালিবের বংশানুক্রম নির্দেশ করে। তাঁর পরিবার মূলত আজারবাইজান অঞ্চলের, যদিও পূর্বপুরুষরা তাবরিজে বসতি স্থাপন করেছিলেন। খামেনেয়ীর পিতা জওয়াদ খামেনেয়ী এবং মাতা খাদিজা মিরদামাদী ছিলেন। তিনি পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান এবং তার দুই ভাইও ধর্মগুরু ছিলেন। ছোটবেলায় খামেনেয়ী ধর্মীয় শিক্ষায় অধ্যয়ন শুরু করেন এবং স্থানীয় শিক্ষকদের কাছে ফিকহ, তাফসীর ও ইসলামী আইন শেখেন।
১৯৫৭ সালে তিনি ইরাকের নাজাফ শহরে চলে যান এবং কিছুদিন পর কোমে বসতি স্থাপন করেন, যেখানে তিনি ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ইসলামী ধর্মশিক্ষা গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি রুহুল্লাহ খোমেইনীর সঙ্গেও পরিচিত হন। তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতা এই সময়েই গড়ে ওঠে। ১৯৬৩ সালে ইসলামী কার্যক্রমে অংশ নেওয়ায় খামেনেয়ী কারাবরণও করেন। পরে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি অফ রাশিয়া থেকে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ফার্সি ও আরবি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন এবং কিছুটা ইংরেজিও বুঝতেন।
খামেনেয়ীর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পর। তিনি সংস্কার কমিশনের সদস্য, উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী, ইসলামী সংসদের স্পিকার এবং তেহরানের ইসলামী ধর্মীয় নেতা হিসেবে কাজ করেন। ইসলামী বিপ্লব চলাকালীন খামেনেয়ী রুহুল্লাহ খোমেইনীর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ছিলেন। তিনি রাজা মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীর শাসনবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি বহুবার গ্রেফতার হন এবং ১৯৭৮ সালে বিদেশে আশ্রয় নেন।
১৯৮১ সালের জুনে সংবাদ সম্মেলনের সময় কাছ থেকে একটি হত্যাচেষ্টা থেকে খামেনেয়ী বেঁচে যান। ওই বিস্ফোরণে তার ডান হাত সারাজীবনের জন্য অক্ষম হয়ে যায়। একই বছর তিনি তৃতীয় ইরানের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত পদটি রাখেন। ১৯৮৯ সালের ৪ জুন, রুহুল্লাহ খোমেইনীর মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ খামেনেয়ীকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। এই পদে তিনি ২০২৬ সালে নিহত হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনেয়ী ইরানের সর্বাধিক ক্ষমতাধারী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ, মিডিয়া, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং পররাষ্ট্রনীতিতে চূড়ান্ত প্রভাবশালী ছিলেন। ইসলামী বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর উপর তার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছিল।
খামেনেয়ী পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেছিলেন এবং বলতেন, পারমাণবিক অস্ত্র ইসলামি বিধান অনুযায়ী নিষিদ্ধ। তবে তিনি বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার সমর্থক ছিলেন। তিনি মানবাধিকারের প্রতি ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করতেন এবং ইসলামী শিক্ষায় বেঁচে থাকার অধিকার, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের গুরুত্ব আরোপ করতেন।
খামেনেয়ী পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচক ছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অবস্থান নিয়েছেন। ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের ক্ষেত্রে তিনি ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে এবং ইসরায়েলকে “ক্ষতিকর টিউমার” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ৯/১১ হামলার পর তিনি সন্ত্রাসবাদের নিন্দা জানিয়েছেন, তবে আফগানিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপের বিপক্ষে ছিলেন।
খামেনেয়ীর ব্যক্তিগত জীবন ছিল ধর্মনিষ্ঠ। তিনি মনসুরে খোজাস্তে বাগেরজাদে’র সঙ্গে বিবাহিত ছিলেন এবং ছয় সন্তানের পিতা ছিলেন। তিনি মাঝে মাঝে আন্তর্জাতিক সাময়িকী যেমন টাইম ও নিউজউইক পড়তেন।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে তেহরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন। তাঁর মৃত্যুতে ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্র শোক ঘোষণা করা হয়। খামেনেয়ীর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম তাকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের একজন করে তোলে। তাঁর জীবন ও কর্মকাণ্ড ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাস এবং ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাসে এক গভীর প্রভাব রেখে গেছে।