1. desherchitrabd@gmail.com : Desher DesherChitra : Desher Chitra
শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০১:৪৫ পূর্বাহ্ন

আলেমরা কেন হারলেন? একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

সম্পাদকীয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন আসনে অংশ নেওয়া আলেম প্রার্থীদের একটি অংশ প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেননি। কেউ কেউ বিজয়ী হলেও সামগ্রিকভাবে আলোচনায় এসেছে ধর্মীয় পরিচিতি থাকা সত্ত্বেও কেন বহু আলেম প্রার্থী পরাজিত হলেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান, ভোটার আচরণ এবং সমকালীন রাষ্ট্র-রাজনীতির কাঠামোগত বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হয়।

প্রথমত, পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির সীমাবদ্ধতা। আলেম প্রার্থীদের বড় শক্তি তাঁদের ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা ও নৈতিক অবস্থান। কিন্তু আধুনিক গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ভোটাররা কেবল ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় নয়, দলীয় কাঠামো, উন্নয়ন পরিকল্পনা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও জোটরাজনীতির সমীকরণ বিবেচনা করেন। ফলে ব্যক্তিগত মর্যাদা অনেক সময় দলীয় ব্র্যান্ড ও সংগঠনশক্তির কাছে পিছিয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, সংগঠনগত দুর্বলতা। বড় দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, এজেন্ট নিয়োগ, প্রচারকৌশল ও ভোটার সংযোগে তারা এগিয়ে থাকে। অনেক আলেম প্রার্থী ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা থাকলেও সমান শক্তিশালী নির্বাচনী যন্ত্র গড়ে তুলতে পারেননি। ফলে ভোটের দিন মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি প্রভাব ফেলেছে।

তৃতীয়ত, ভোটারদের অগ্রাধিকার বদল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থান, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সুশাসনকে প্রধান ইস্যু হিসেবে দেখছেন। ধর্মীয় মূল্যবোধ তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি একমাত্র নির্ধারক নয়। যারা উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সুস্পষ্ট রূপরেখা দিতে পেরেছেন, তারা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থেকেছেন।

চতুর্থত, জোট ও কৌশলগত ভোটিং। বহুদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভোট বিভাজন বড় ভূমিকা রাখে। কোথাও একই মতাদর্শঘনিষ্ঠ একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ভোট ছড়িয়ে গেছে। আবার অনেক ভোটার ‘জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা’ বিবেচনায় কৌশলগত ভোট দিয়েছেন যাকে রাজনৈতিক বিজ্ঞানে স্ট্র্যাটেজিক ভোটিং বলা হয়। এতে তুলনামূলক ছোট বা নবীন প্ল্যাটফর্মের প্রার্থীরা পিছিয়ে পড়েছেন।

পঞ্চমত, ভাবমূর্তি ও প্রচার কৌশল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর প্রচার এখন নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলে। অনেক আলেম প্রার্থী ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে প্রচারে অভ্যস্ত হলেও আধুনিক মিডিয়া ব্যবস্থাপনায় পিছিয়ে ছিলেন। অন্যদিকে বড় দলগুলো ডাটা-ভিত্তিক প্রচার, ইমেজ ম্যানেজমেন্ট ও বার্তা-নির্ধারণে দক্ষতা দেখিয়েছে।

ষষ্ঠত, ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক। সমাজের একটি অংশ ধর্মীয় নেতৃত্বকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পরিসরে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে নয়। ফলে কিছু ভোটার ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে তাঁদের সমর্থন দেননি।

সবশেষে বলা যায়, আলেম প্রার্থীদের পরাজয় একক কোনো কারণে নয়; বরং এটি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল। সাংগঠনিক শক্তি, ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি, জোটকৌশল, আধুনিক প্রচার এবং ভোটার মনস্তত্ত্ব সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব এখানে কাজ করেছে। ভবিষ্যতে যারা ধর্মীয় পটভূমি থেকে রাজনীতিতে আসতে চান, তাঁদের জন্য শিক্ষা হলো নৈতিক গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি সুসংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো ও সময়োপযোগী নীতিনির্ধারণ অপরিহার্য।

Share this Post in Your Social Media

এই ধরনের আরও খবর
Copyright © 2026, সাপ্তাহিক দেশের চিত্র. All rights reserved.
Theme Customized By BreakingNews