মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম
মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পাশাপাশি দুই দেশের সামরিক সক্ষমতা নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। সামরিক বাজেট, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, পারমাণবিক সক্ষমতা, নৌ ও বিমান শক্তি সব মিলিয়ে দুই দেশের সামরিক শক্তির চিত্রে রয়েছে সুস্পষ্ট পার্থক্য, আবার কিছু ক্ষেত্রে রয়েছে কৌশলগত ভারসাম্যও।
সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে শীর্ষস্থানীয়। প্রতিবছর দেশটি প্রতিরক্ষা খাতে শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে, যা বিশ্বের বহু দেশের সম্মিলিত সামরিক বাজেটের চেয়েও বেশি। এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্র উন্নত যুদ্ধবিমান, বিমানবাহী রণতরী, পারমাণবিক সাবমেরিন, ড্রোন প্রযুক্তি ও সাইবার যুদ্ধ সক্ষমতায় আধিপত্য বজায় রেখেছে। বিপরীতে ইরানের সামরিক বাজেট তুলনামূলকভাবে অনেক কম। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে তেহরানকে সীমিত সম্পদ দিয়েই প্রতিরক্ষা কৌশল সাজাতে হয়।
বিমান শক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। দেশটির হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক স্টেলথ যুদ্ধবিমান, যেমন F-35 Lightning II এবং F-22 Raptor। এছাড়া বি-২ স্পিরিটের মতো কৌশলগত বোমারু বিমান দূরপাল্লার হামলায় সক্ষম। অন্যদিকে ইরানের বিমানবহরের বড় অংশই পুরোনো মডেলের, যদিও তারা নিজস্ব ড্রোন প্রযুক্তি ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান আঞ্চলিক সংঘাতে ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন ধরনের কৌশলগত সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে।
নৌ শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বৈশ্বিক। তাদের একাধিক বিমানবাহী রণতরী ও পারমাণবিক সাবমেরিন রয়েছে, যা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে দ্রুত মোতায়েন করা সম্ভব। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। অন্যদিকে ইরান ছোট ও দ্রুতগতির নৌযান, মিসাইল বোট ও উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে অসম যুদ্ধকৌশল (asymmetric warfare) অনুসরণ করে। সরাসরি শক্তির লড়াইয়ে পিছিয়ে থাকলেও সংকীর্ণ জলপথে ইরানের কৌশলগত সুবিধা রয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির ক্ষেত্রে ইরান আঞ্চলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান গড়ে তুলেছে। দেশটি মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও পরীক্ষায় সফল হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা জানিয়েছে। এই সক্ষমতা ইরানকে প্রতিবেশী অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করে। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (ICBM), উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক নজরদারি নেটওয়ার্কে অনেক এগিয়ে। তাদের বহুমাত্রিক প্রতিরক্ষা ছাতার মধ্যে রয়েছে স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
পারমাণবিক অস্ত্রের প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র একটি স্বীকৃত পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং তাদের কাছে বিপুল সংখ্যক পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। অন্যদিকে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি অস্বীকার করে এবং দাবি করে তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। তবে এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক রয়েছে এবং বিষয়টি দুই দেশের উত্তেজনার অন্যতম প্রধান কারণ।
সামরিক জোট ও কৌশলগত মিত্রতার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে। ন্যাটোসহ একাধিক আন্তর্জাতিক জোটে তাদের প্রভাব রয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। ইরান তুলনামূলকভাবে আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল কৌশল অনুসরণ করে, যা সরাসরি যুদ্ধে না গিয়েও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়।
সবশেষে বলা যায়, সামরিক প্রযুক্তি, বাজেট ও বৈশ্বিক উপস্থিতির বিচারে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টতই শক্তিশালী। তবে ইরান সীমিত সম্পদ নিয়ে কৌশলগতভাবে নিজেদের প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখার সক্ষমতা তৈরি করেছে। সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে শক্তির ভারসাম্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ঝুঁকতে পারে, কিন্তু অসম যুদ্ধকৌশল ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় ইরানকেও হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তাই দুই দেশের সামরিক শক্তির তুলনা কেবল সংখ্যার হিসেবে নয়, বরং কৌশল ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
লেখক ও গবেষক