ধর্ম ডেস্ক
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য নির্ধারিত। এই দ্বীনের মূল ভিত্তি হলো কোরআন ও সুন্নাহ। তাই ইসলামের কোনো আমল বা ইবাদত তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন তা রাসুল (সা.)-এর দেখানো পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে সময়ের সাথে সাথে মুসলিম সমাজে এমন অনেক কাজ প্রচলিত হয়েছে, যেগুলোকে ধর্মের অংশ হিসেবে মনে করা হলেও বাস্তবে সেগুলো বিদআত অর্থাৎ দ্বীনের মধ্যে নতুন সংযোজন, যার কোনো প্রমাণ কোরআন ও সুন্নাহতে নেই। রাসুল (সা.) স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন যে, দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজন করা হলে তা প্রত্যাখ্যাত হবে। তাই একজন সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব হলো সুন্নাহ ও বিদআতের পার্থক্য বোঝা এবং সঠিক পথ অনুসরণ করা।
বর্তমান সমাজে যে বড় বড় বিদআতগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তার মধ্যে প্রথমত উল্লেখযোগ্য হলো মিলাদ মাহফিলকে বাধ্যতামূলক ইবাদত হিসেবে মনে করা। অনেকেই মনে করেন, নির্দিষ্ট নিয়মে মিলাদ আয়োজন না করলে রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পায় না, অথচ সাহাবায়ে কেরাম কখনো এভাবে তা পালন করেননি; প্রকৃত ভালোবাসা হলো তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা।
দ্বিতীয়ত, কবরকে কেন্দ্র করে অতিরঞ্জিত আচরণ, যেমন কবরের কাছে গিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করা, মানত করা বা অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন করা এসব কাজ ইসলাম সমর্থন করে না এবং অনেক ক্ষেত্রে শিরকের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
তৃতীয়ত, মৃত ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট দিন যেমন তিন দিন, সাত দিন বা চল্লিশ দিনে খতম বা ফাতেহা আয়োজনকে বাধ্যতামূলক মনে করা; যদিও মৃতের জন্য দোয়া করা উত্তম, তবে নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করে আনুষ্ঠানিকতা তৈরি করা সুন্নাহসম্মত নয়।
চতুর্থত, শবে বরাতকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট রীতি-নীতি যেমন বিশেষ খাবার রান্না, আলোকসজ্জা বা আতশবাজিকে ধর্মীয় অংশ মনে করা, যা ইসলামে নির্ধারিত নয়।
পঞ্চমত, ধর্ম পালনে অতিরিক্ত কঠোরতা বা চরমপন্থা অবলম্বন করা, যেখানে মানুষ নিজের ওপর এমন বোঝা চাপায় যা ইসলাম অনুমোদন করে না; অথচ রাসুল (সা.) সবসময় মধ্যপন্থার শিক্ষা দিয়েছেন।
ষষ্ঠত, তাবিজ কবজের ওপর অন্ধ বিশ্বাস স্থাপন করা, যেখানে মানুষ আল্লাহর ওপর ভরসা না করে বস্তুগত কিছু জিনিসে নির্ভর করে; যদিও কিছু দোয়া বা কোরআনের আয়াত ব্যবহার বৈধ হতে পারে, কিন্তু অন্ধ বিশ্বাস বিদআতের পর্যায়ে পড়ে।
সপ্তমত, ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত জাঁকজমকপূর্ণ করে তোলা এবং অপচয়ে লিপ্ত হওয়া, যা ইসলামের সরলতা ও সংযমের নীতির বিরুদ্ধে যায়।
অষ্টমত, নির্দিষ্ট পোশাক বা রীতিকে বাধ্যতামূলক ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, যদিও ইসলাম মূলত শালীনতার ওপর গুরুত্ব দেয়, নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পোশাককে নয়।
নবমত, ইবাদতের ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছামতো সংখ্যা বা পদ্ধতি নির্ধারণ করা, যেমন নির্দিষ্ট সংখ্যায় জিকির বা দোয়া নির্ধারণ করে নেওয়া যা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়; এতে ইবাদত ধীরে ধীরে বিকৃত হয়ে যায়।
দশমত, ধর্মীয় আবেগ সৃষ্টি করার জন্য ভিত্তিহীন গল্প, অলৌকিক কাহিনি বা অতিরঞ্জিত ঘটনা প্রচার করা, যা মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা সৃষ্টি করে এবং প্রকৃত ইসলামী শিক্ষাকে আড়াল করে দেয়। এসব বিদআত সমাজে ধীরে ধীরে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে অনেক মানুষ এগুলোকে ইসলামের অংশ মনে করতে শুরু করেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক জ্ঞান অর্জন করা এবং প্রতিটি আমল করার আগে তার দলিল যাচাই করা। কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে জীবন পরিচালনা করা এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে সচেতনতা তৈরি করা দরকার, যাতে মানুষ আবেগ নয়, বরং জ্ঞানের ভিত্তিতে দ্বীন পালন করতে পারে।
ইসলামের সৌন্দর্য তার সরলতা, ভারসাম্য এবং বিশুদ্ধতার মধ্যে নিহিত। তাই আমাদের উচিত যা সুন্নাহ, তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা এবং যা বিদআত, তা পরিহার করা।
কারণ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজন করা যতটা সহজ, তা থেকে ফিরে আসা ততটাই কঠিন। একজন মুসলমানের প্রকৃত সফলতা এখানেই যে, সে রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথ অনুসরণ করবে এবং নিজের জীবনকে সেই অনুযায়ী গড়ে তুলবে।
বর্তমান সময়ে যখন বিভিন্ন বিভ্রান্তি ও ভুল প্রথা সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন সুন্নাহর প্রতি ফিরে আসাই হতে পারে মুক্তির একমাত্র পথ।