দেশের চিত্র ডেস্ক
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন সম্পর্কিত বিশাল নথিপত্র, বা ‘এপস্টেইন ফাইলস’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এ ফাইলগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম থাকার খবর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, এবং এর মধ্যেই বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম নামটি কিছু প্রকাশ্য সংবাদ মাধ্যমেও উল্লেখ হয়েছে।
আলোচিত এ নথি মূলত জেফ্রি এপস্টেইনের দীর্ঘ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার সময় সংগৃহীত হাজার হাজার পৃষ্ঠার আইনি নথি, ইমেইল, ছবি ও ভিডিও সমন্বয়ে গঠিত। এই নথিতে বিভিন্ন ধরণের তথ্য উঠে এসেছে—যেমন সহিংস অপরাধ, মানব পাচার, যৌন শোষণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণাদি। কিন্তু এই নথির অর্থটি কী, এবং ব্যক্তিগতভাবে কোন নামের উপস্থিতি মানেই অপরাধ প্রমাণ হয়েছে কি না তা আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
সম্প্রতি প্রকাশিত ফাইলের একটি অংশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামের উল্লেখ থাকা নিয়ে কয়েকটি অনলাইন পোর্টালে রিপোর্ট করা হয়েছে যে এই ফাইলগুলোতে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নামেও পাওয়া গেছে। খবরগুলোতে বলা হয়েছে, এপস্টেইন নথি বিশ্লেষণে রয়েছে এমন কিছু তথ্য যেখানে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিয়েও উল্লেখ ঘটেছে।
তবে সেই তথ্যে সরাসরি কোনো ভুল তথ্য বা নিশ্চিত প্রমাণ তুলে ধরা হয়নি যে শেখ হাসিনা এপস্টেইনের সঙ্গে কোনো অপরাধমূলক বা অনৈতিক যোগাযোগে জড়িত ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রেই এধরনের তালিকায় নামে থাকা মানেই অপরাধী নয় এটি কেবল সেই নথির অংশ হতে পারে যেখানে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব বা সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে উল্লেখ আছে এমন নথি সংযুক্ত রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সত্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান Rumor Scanner জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে যে জেফ্রি এপস্টেইনের একজন সহকারী শেখ হাসিনার সঙ্গে গোপন কোনো চুক্তি করেছিলেন এমন দাবি ভুয়া ও ভিত্তিহীন। এ ধরনের দাবির কোনো প্রমাণ নেই, এবং এই গুজবটি সত্য বলে ধরে নেওয়া অনুচিত।
এপস্টেইন ফাইলের মূল ইস্যুই হলো একটি গুরুতর অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে সংগৃহীত নথিপত্রের বিশাল সমষ্টি, যা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তির উল্লেখ, যোগাযোগ বা উপস্থিতি সংবলিত হতে পারে। কিন্তু তা দিয়ে সরাসরি সন্দেহযুক্ত বা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী বলে ঘোষণা করা যায় না, যতক্ষণ না কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও বিচারের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয়। আন্তর্জাতিক বিচারে অনেক সময় এধরনের তথ্যের উপস্থিতি এবং বাস্তবে অপরাধের প্রমাণ দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য থাকে, যা বোঝা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক বা সামাজিক নেতাদের নাম এধরনের নথিতে থাকার মানে নেই যে তারা অপরাধে জড়িত ছিলেন। ফাইলগুলোতে কেবল যোগাযোগ, সাক্ষাৎ, ইমেইল বা নথি সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় থাকতে পারে যা ব্যাখ্যা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রসঙ্গে উল্লেখ থাকে। এর মানে এই নয় যে সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনও ভুল বা অপরাধ ঘটেছে। সেই কারণে প্রতিবেদন বা সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, যাতে অপ্রমাণিত গুজব বা ভুল তথ্য ছড়িয়ে জনমনে অপ্রীতিকর ধারনা তৈরি না হয়।
এপস্টেইন ফাইলস নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আচরণ, এবং বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় সরগরম হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক, উদ্দ্যোক্তা ও বিনোদন জগতের ব্যক্তিত্বের নাম এ ফাইলের বিভিন্ন অংশে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু এর মানে কখনোই একটি পক্ষের বিরুদ্ধে পূর্বধারণা তৈরি করে দেওয়া উচিত নয় যতক্ষণ না সেই বিষয়ে স্পষ্ট প্রমাণ ও উপসংহার আছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংবাদটি বিশেষভাবে নজর কাড়ছে, কারণ একটি আন্তর্জাতিক বিতর্কের সঙ্গে একটি দেশে রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিত্বের নাম জড়িয়ে পড়েছে বলে দাবি উঠেছে। বাস্তবে, এ ধরনের আলোচনায় সতর্ক থাকা প্রয়োজন এবং তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। আন্তর্জাতিক ফাইলের উল্লেখযোগ্য অংশগুলো রাজনীতিবিদ, সামাজিক নেতা, কর্পোরেট নেতাদের বিভিন্ন সময়ে পেশাগত সম্পর্ক, সভা বা বৈঠকের কারণে নথিভুক্ত থাকতে পারে যা অপরাধের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।
সমগ্র পরিস্থিতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট এপস্টেইন ফাইলস একটি আন্তর্জাতিক তদন্তের বড় নথি, যার বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা বিভিন্ন রকমের গুজব ও তথ্যের সৃষ্টি করেছে। এই নথিতে নাম থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়। যে কোনো প্রতিবেদনে অবশ্যই নির্ভরযোগ্য তথ্য, যাচাই বা সরকারি বিবৃতি অন্তর্ভুক্ত করে বলা উচিত যে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম নথিতে থাকলে তা অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত হয় না। সুতরাং, শেখ হাসিনার নাম এপস্টেইন ফাইলের কোন অংশে থাকুক বা না থাকুক তা নিয়ে গুজবের বদলে তথ্যভিত্তিক সংবাদ ও বিশ্লেষণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।