ধর্ম ডেস্ক
মানব জীবনের নিয়মিত অংশ হলো সমস্যা, বিপদ এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি। জীবন কখনও সম্পূর্ণ সুখকর হয় না, বরং বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে আসে। কখনও তা শারীরিক অসুস্থতা, কখনও আর্থিক সঙ্কট, কখনও পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যা, আবার কখনও মানসিক ও আবেগগত দুশ্চিন্তা আকারে আমাদের সামনে আসে। এ ধরনের সময়ে মানুষ প্রায়শই আতঙ্কিত, হতাশ বা একা অনুভব করে। প্রকৃত মুসলিম হিসেবে আমাদের শিখতে হবে যে, বিপদ ও দুঃসময়ে সবচেয়ে শক্তিশালী আশ্রয় হলো আল্লাহর প্রতি ভরসা করা এবং তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা।
ইসলামে বিপদ ও সমস্যার সময় আল্লাহর দিকে আশ্রয় নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। কোরআন ও হাদিসে বহুবার এ বিষয়ে নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “এবং যখন তোমাদের মধ্যে একজন বিপদগ্রস্ত হয়, তখন সে আমাদের কাছে দো‘আ পাঠায়। অতএব আমরা তাকে বিপদ থেকে মুক্তি দেই।” (সূরা আল-আনবিয়া: ৮৭)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, মানুষ যখন নিজের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা স্বীকার করে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, তখন আল্লাহ তার সাহায্য অবিলম্বে প্রেরণ করেন। এই দো‘আ কেবল ভদ্র ও বিনম্র আত্মার প্রকাশ নয়, বরং এটি মানুষের তাওহীদ (এক আল্লাহর ওপর বিশ্বাস) ও আত্মসমালোচনার প্রমাণ।
নবী যূনুস (আ.) এর জীবন আমাদের এ বিষয়ে অসাধারণ উদাহরণ। তিনি নিনবার নগরীর মানুষদের আল্লাহর নীতি ও আদেশের দিকে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু মানুষ তার বার্তা মানতে চায়নি। হতাশা ও কষ্টে তিনি সমুদ্রের দিকে যাত্রা করেন এবং সমুদ্রের মাছের পেটে ঢুকে পড়েন। সেই অন্ধকার ও বিপদে তিনি আল্লাহর কাছে দো‘আ পাঠ করেন: “লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ-জালিমীন”। অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আপনি পরিপূর্ণ, এবং আমি সত্যিই অন্যায়কারী। এই দো‘আ পাঠ করার পর আল্লাহ তাঁকে মাছের পেট থেকে মুক্ত করেন। এটি আমাদের শেখায় যে, বিপদ ও সংকটের সময় আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেয়া শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের আত্মিক শক্তি ও মানসিক শান্তি নিশ্চিত করে।
বিপদে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কেবল বড় বিপদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের সময়ও আল্লাহর সাহায্য কামনা করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা যখন পরীক্ষার চাপ অনুভব করে বা চাকরিপ্রার্থীরা যখন চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে, তখন তারা আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে শান্তি ও সফলতার আশায় বিশ্বাস রাখতে পারে। এমনকি পারিবারিক ঝগড়া, আর্থিক সমস্যা বা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা, সব ক্ষেত্রেই আল্লাহর দিকে দৃষ্টি রেখে আমরা সমাধানের পথ খুঁজতে পারি।
আল্লাহর কাছে দো‘আ পাঠ করার মাধ্যমে আমরা আমাদের আত্মসমালোচনা ও দোষ স্বীকারের শিক্ষা পাই। বিপদে পড়ে মানুষ প্রায়শই নিজের ভুলের দিকে মনোযোগ দেয় না, তবে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করার সময়, আমরা স্বীকার করি যে আমরা দুর্বল, সীমাবদ্ধ এবং ভুল করতে পারি। এটি আমাদের অহংকার দূর করে এবং আমাদের নরম মন ও বিনয়ী চরিত্র গড়ে তোলে। আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়ার সময় আমরা শুধু সমস্যার সমাধি চাই না, বরং আমাদের আত্মার উন্নতি ও নৈতিক জ্ঞানেরও জন্য সাহায্য প্রার্থনা করি।
বিপদে আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়া আমাদের বিশ্বাসকে শক্তিশালী করে। যখন মানুষ নিজের সক্ষমতা ও শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে, তখন প্রায়ই হতাশা ও উদ্বেগে পড়ে। তবে আল্লাহর কাছে আশ্রয় নিলে আমরা বুঝতে পারি যে সমস্ত শক্তি আল্লাহর হাতে রয়েছে এবং তিনি যে কোনো পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে সক্ষম। এটি আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, এবং বিপদ মোকাবেলায় ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও দৃঢ়তা প্রদান করে। নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি বিপদে পড়লে আল্লাহর কাছে দো‘আ করে, আল্লাহ তাকে সমাধান দেন।” এই হাদিসের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বিপদ ও সমস্যা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও, আল্লাহর সাহায্য সবসময় আমাদের সঙ্গে রয়েছে।
আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানসিক শান্তি ও ধৈর্য অর্জন। বিপদে মানুষ প্রায়শই আতঙ্কিত হয়, অবসাদগ্রস্ত হয় এবং মানসিক চাপের শিকার হয়। তবে আল্লাহর কাছে দো‘আ পাঠ করলে আমরা অনুভব করি যে আমরা একা নই, আমাদের প্রতি আল্লাহর দৃষ্টি রয়েছে এবং তিনি আমাদের সাহায্য করতে প্রস্তুত। এটি আমাদের মানসিক চাপ কমায় এবং ধৈর্য ধরে পরিস্থিতির মোকাবেলা করার শক্তি প্রদান করে।
এছাড়াও, বিপদে আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়া আমাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নে সাহায্য করে। আমরা যখন আমাদের ভুল, সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা স্বীকার করি, তখন আমাদের চরিত্রে বিনয় ও সদাচার বৃদ্ধি পায়। এটি আমাদের আত্মকেন্দ্রিকতা দূর করে এবং আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে। এইভাবে, বিপদে আল্লাহর কাছে দো‘আ পাঠ করা শুধু শারীরিক বা অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান নয়, বরং এটি আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
সমগ্র জীবনের চলার পথে প্রতিটি ব্যক্তি বিপদ, চ্যালেঞ্জ এবং অসুবিধার মুখোমুখি হয়। এটি নিরপেক্ষ সত্য যে, বিপদ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে বিপদে পড়লে আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়া আমাদের মানসিক শান্তি, আধ্যাত্মিক শক্তি এবং সমস্যার সমাধান দিতে পারে। কোরআন ও হাদিসের উদাহরণ আমাদের শেখায় যে, যারা বিপদে আল্লাহর কাছে দো‘আ করে এবং তাঁর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে, তাদের বিপদ থেকে মুক্তি এবং শান্তি লাভ হয়।
অতএব, একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত জীবনের প্রতিটি সংকট এবং বিপদে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া। এটি কেবল আমাদের আত্মিক উন্নতি নিশ্চিত করে না, বরং আমাদের মানসিক শান্তি ও ধৈর্য বৃদ্ধি করে এবং জীবনের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলায় শক্তি প্রদান করে। বিপদ আসবে, এটি অপ্রতিরোধ্য, তবে আল্লাহর সাহায্য সবসময় আমাদের হাতে। তাই আমরা কখনও হতাশ হওয়া উচিত নয়, বরং বিপদে আল্লাহর কাছে দো‘আ পাঠ করে, আমাদের বিশ্বাস ও ধৈর্য ধরে রাখলে, আল্লাহ আমাদের মুক্তি ও সমাধান প্রদান করবেন।