ধর্ম ডেস্ক
সুরা: বনি ইসরাঈল
আয়াত: ২৩
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
وَ قَضٰی رَبُّكَ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّاۤ اِیَّاهُ وَ بِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا…
সরল অনুবাদ:
“তোমার রব আদেশ দিয়েছেন—তোমরা তিনি ছাড়া আর কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে। তারা একজন বা উভয়ই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের ‘উফ’ বলো না, তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।” (বনি ইসরাঈল: ২৩)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাওহীদের নির্দেশের পরপরই পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের আদেশ দিয়েছেন। এখানে قَضٰى শব্দটি ‘আদেশ দিয়েছেন’, ‘অসিয়ত করেছেন’ কিংবা ‘শরিয়তগত ফয়সালা করেছেন’—এই অর্থগুলোতে ব্যবহৃত হয়েছে বলে মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন (ইবন কাসীর, আত-তাফসিরুস সা‘দী)।
আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের সঙ্গে পিতা-মাতার সদ্ব্যবহারকে একত্রে ফরজ করেছেন। অন্য আয়াতেও তিনি নিজের শোকরের সঙ্গে পিতা-মাতার শোকরকে যুক্ত করেছেন “আমার শোকর আদায় কর এবং পিতা-মাতারও।” (সূরা লুকমান: ১৪)
এ থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহর ইবাদতের পর পিতা-মাতার আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতা ইসলামে সর্বোচ্চ গুরুত্ব বহন করে।
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলেন ,আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি?
তিনি বললেন, সময়মতো সালাত আদায় করা।
পুনরায় জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা।
(মুসলিম, হাদিস: ৮৫)
রাসুলুল্লাহ ﷺ আরও বলেন “পিতা জান্নাতের মধ্যবর্তী দরজা। ইচ্ছা করলে একে রক্ষা করো, অথবা নষ্ট করে দাও।”
(তিরমিজি, হাদিস: ১৯০১)
আরও বলেছেন “আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত।”
(তিরমিজি, হাদিস: ১৮৯৯)
পিতা-মাতা যদি মুসলিম না-ও হন, তবুও তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা ওয়াজিব। আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁর মুশরিক মায়ের বিষয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন “তোমার মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর।”
(মুসলিম, হাদিস: ১০০৩)
তবে আল্লাহর নাফরমানির কাজে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য বৈধ নয় এ ক্ষেত্রেই শুধু পিতা-মাতার আদেশ মানা যাবে না। কিন্তু দুনিয়াবি জীবনে তাদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখা আবশ্যক (লুকমান: ১৫; আনকাবুত: ৮)।
বার্ধক্যে পিতা-মাতা সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এ সময় সামান্য বিরক্তিও তাদের হৃদয়ে গভীর কষ্ট সৃষ্টি করে। তাই কোরআনে ‘উফ’ শব্দটিও নিষিদ্ধ করা হয়েছে—যা বিরক্তির ক্ষুদ্রতম প্রকাশ।
আল্লাহ তাআলা সন্তানের শৈশবের কথা স্মরণ করিয়ে দেন—যখন পিতা-মাতা নিজেদের আরাম বিসর্জন দিয়ে সন্তানের লালন-পালন করেছেন। এখন সেই ঋণ শোধ করাই সন্তানের দায়িত্ব।
ইসলাম পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারকে কেবল সামাজিক নৈতিকতা নয়; বরং তাওহীদের পর সর্বোচ্চ ফরজ হিসেবে ঘোষণা করেছে। জীবিত অবস্থায় সেবা, কথা ও আচরণে সম্মান—এবং মৃত্যুর পর তাদের বন্ধু ও আত্মীয়দের সঙ্গে সদ্ব্যবহার সবই ঈমানের অপরিহার্য দাবি।