সম্পাদকীয়
বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তেজনা, আঞ্চলিক সংঘাত ও পরাশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা উসকে দিচ্ছে। ইতিহাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানবসভ্যতার জন্য ভয়াবহ পরিণতি বয়ে এনেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্ব অনেক শিক্ষা নিলেও বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নানা সংকট একত্রিত হয়ে নতুন বৈশ্বিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো পরাশক্তিগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া এর মধ্যে সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে রাশিয়া ও পশ্চিমা জোটের সরাসরি মুখোমুখি অবস্থান এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনা বিশ্ব রাজনীতিকে দ্বিধাবিভক্ত করে তুলেছে। বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি বা সীমিত সংঘাত দ্রুত বড় যুদ্ধে রূপ নিতে পারে এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আঞ্চলিক সংঘাতও বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি বহন করে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা কিংবা কোরীয় উপদ্বীপে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা সবই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ। কোনো একটি সংঘাতে পরাশক্তির সরাসরি জড়িত হওয়া পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। ইতিহাস বলছে, ছোট সংঘাত থেকেই বড় যুদ্ধের সূচনা হয়েছে।
পারমাণবিক অস্ত্র ও আধুনিক প্রযুক্তি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কাকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের পর বিশ্ব বুঝেছে এই অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা কতটা মারাত্মক। বর্তমানে একাধিক দেশ পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী। যদি কোনো আঞ্চলিক সংঘাত পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সরাসরি যুদ্ধে পরিণত হয়, তবে তার পরিণতি হতে পারে নজিরবিহীন।
সাইবার যুদ্ধ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তিও নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক বা সামরিক কমান্ড সিস্টেমে সাইবার হামলা বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থার ব্যবহার যুদ্ধের গতি ও মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। প্রযুক্তিগত ভুল বা ভুল সিগন্যাল থেকেও বড় সংঘাতের সূত্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও জ্বালানি রাজনীতিও উত্তেজনার আরেকটি উৎস। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, জ্বালানি সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যযুদ্ধ কখনো কখনো সামরিক উত্তেজনার রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে তাইওয়ান প্রণালি বা দক্ষিণ চীন সাগরের মতো কৌশলগত অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা থাকলেও তা এড়ানোর শক্তিশালী উপাদানও রয়েছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা, কূটনৈতিক সংলাপ ও অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা বড় শক্তিগুলোকে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত রাখে। পরমাণু অস্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা এবং পারস্পরিক ধ্বংসের আশঙ্কা (Mutually Assured Destruction) রাষ্ট্রগুলোকে সতর্ক করে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী এমনটা বলা না গেলেও বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান অস্থিরতা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আঞ্চলিক সংঘাত, পারমাণবিক অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, সংলাপ ও সমঝোতার বিকল্প নেই। কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার না হলে ছোট কোনো স্ফুলিঙ্গ থেকেও বড় অগ্নিকাণ্ডের জন্ম হতে পারে।