দেশে মাদক ব্যবসায় বছরে ঘুরছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই সেই ফাঁক গলে সক্রিয় হয়ে উঠেছে মাদক কারবারি চক্র। সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচনী প্রস্তুতির কারণে বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযান কমে যাওয়ায় এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সারা দেশে নির্বিঘ্নে মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো।
ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত হয়ে জলপথ, স্থলপথ এমনকি আকাশপথেও দেশে ঢুকছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, আইসসহ নানা ধরনের নেশাজাত দ্রব্য। সীমান্ত এলাকা পেরিয়ে এসব মাদক এখন শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে, যা জননিরাপত্তার জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রবেশ করা মোট মাদকের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ আটক করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি অংশ চলে যাচ্ছে সরাসরি বাজারে। কৌতূহল, পারিবারিক অশান্তি, বেকারত্ব, হতাশা, প্রেমে ব্যর্থতা ও অসৎ সঙ্গের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাবের কারণে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মাদকের ফাঁদে জড়াচ্ছে। পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের মধ্যেও মাদকাসক্তির প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।
বেসরকারি সংস্থা মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)-এর হিসেবে দেশে বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। প্রতি বছর মাদক কেনাবেচায় ব্যয় হচ্ছে আনুমানিক ৬০ হাজার কোটি টাকা। এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে প্রায় দুই লাখ মানুষ। শুধু তাই নয়, মাদকের কারণে প্রতিবছর দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে প্রায় ৪৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে সীমান্তসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। এসব অভিযানে কোটি পিস ইয়াবা, বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল ও ক্রিস্টাল মেথ জব্দ করা হলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্ধার মোট প্রবাহের তুলনায় অপ্রতুল।
ডিএনসির মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ দাবি করেন, নির্বাচন সামনে রেখেও মাদকবিরোধী অভিযান বন্ধ হয়নি। বরং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে আরও কঠোর অবস্থানে রয়েছে ডিএনসি। অন্যদিকে মানসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরীর মতে, জাতীয় ইস্যুতে নজর সরে যাওয়ায় মাদক মাফিয়ারা দেশজুড়ে আবারও শক্ত অবস্থান তৈরি করছে।
বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, নির্বাচনী দায়িত্ব থাকলেও গোয়েন্দা নজরদারি ও টার্গেটেড অভিযানের মাধ্যমে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় রাষ্ট্রীয় আয়োজনের সময় প্রশাসনিক ব্যস্ততাই মাদক চক্রের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, একটি পুরো প্রজন্ম মানসিক ও সামাজিকভাবে চরম ঝুঁকিতে পড়বে।