দেশের চিত্র ডেস্ক
বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দুই সংঘাত হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই দুই যুদ্ধ শুধু ইউরোপ নয়, পুরো বিশ্বরাজনীতির গতিপথ বদলে দেয়। কোটি মানুষের প্রাণহানি, সাম্রাজ্যের পতন এবং নতুন শক্তির উত্থান সব মিলিয়ে এই যুদ্ধগুলোর কারণ ও প্রেক্ষাপট আজও গবেষণার বিষয়। উভয় যুদ্ধের পেছনে ছিল জটিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক কারণের সমন্বয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ইউরোপে তীব্র জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা, সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং জোটরাজনীতি। উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুর দিকে ইউরোপীয় শক্তিগুলো আফ্রিকা ও এশিয়ায় উপনিবেশ বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। একই সঙ্গে জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও রাশিয়ার মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকে। দুইটি প্রধান সামরিক জোট গড়ে ওঠে ট্রিপল অ্যালায়েন্স ও ট্রিপল আন্তান্ত যা মহাদেশকে বিভক্ত করে।
এই উত্তেজনার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে ১৯১৪ সালের জুনে, যখন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দকে সারায়েভোতে হত্যা করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জোটভুক্ত দেশগুলো দ্রুত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে জার্মানি, রাশিয়া, ফ্রান্স ও ব্রিটেন একে একে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এটি ইউরোপীয় যুদ্ধ থেকে বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ নেয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চার বছর স্থায়ী হয় এবং ১৯১৮ সালে জার্মানির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। যুদ্ধ শেষে ১৯১৯ সালে ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এই চুক্তির কঠোর শর্তই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ বপন করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পেছনে প্রধান কারণ ছিল ভার্সাই চুক্তির প্রতি জার্মানির ক্ষোভ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থান। ১৯৩০-এর দশকে জার্মানিতে আডলফ হিটলার ক্ষমতায় আসেন এবং জাতীয়তাবাদী ও সম্প্রসারণবাদী নীতি গ্রহণ করেন। তিনি জার্মানিকে সামরিকভাবে পুনর্গঠন করেন এবং ইউরোপে ভূখণ্ড সম্প্রসারণ শুরু করেন। ইতালিতে মুসোলিনি এবং জাপানে সামরিকবাদী শাসনের উত্থানও বিশ্ব পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়েই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। যুদ্ধ দ্রুত ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪১ সালে জাপানের পার্ল হারবার আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যোগ দিলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়। মিত্রশক্তি ও অক্ষশক্তির মধ্যে এই লড়াই ছয় বছর ধরে চলে এবং ১৯৪৫ সালে জার্মানি ও জাপানের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ছিল অভূতপূর্ব। হলোকাস্টে লাখো ইহুদি নিহত হন, হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়, এবং বিশ্বজুড়ে প্রায় সাত থেকে আট কোটি মানুষ প্রাণ হারান। যুদ্ধ শেষে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বিধাবিভক্ত প্রভাব শুরু হয়, যা পরবর্তীতে ঠান্ডা যুদ্ধের জন্ম দেয়।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ ছিল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক সংকট ও জোটরাজনীতির জটিল সমন্বয়। একটি যুদ্ধের সমাপ্তি অন্য যুদ্ধের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। ইতিহাসবিদদের মতে, ন্যায়সঙ্গত শান্তি ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের অভাবই এই দুই বৈশ্বিক বিপর্যয়ের অন্যতম শিক্ষা।