বাংলাদেশ এই ভূখণ্ড শুধু মানচিত্রের একটি নাম নয়, এটি কোটি মানুষের আশা, স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রতীক। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও আজ একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে বারবার ফিরে আসে বাংলাদেশ আসলে কার কাছে নিরাপদ? ক্ষমতাবানদের কাছে, নাকি সাধারণ মানুষের কাছে? দলীয় পরিচয়ধারীদের কাছে, নাকি ভিন্নমত পোষণকারীদের কাছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ।
একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে নিরাপদ হয়, যখন সেখানে সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে বসবাস করতে পারে। যখন চাঁদাবাজি, দখলদারি, দলবাজি কিংবা পেশিশক্তির দাপটে কেউ জিম্মি থাকে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সমাজে আজও অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ছত্রচ্ছায়ায় চাঁদাবাজি একটি নীরব বাস্তবতা হয়ে আছে। নিরাপদ বাংলাদেশ মানে এমন দেশ, যেখানে কাউকে ব্যবসা চালাতে, বাড়ি বানাতে কিংবা রাস্তায় চলতে চাঁদা দিতে হয় না।
নিরাপদ বাংলাদেশ মানে দলবাজির অবসান। যেখানে প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা সামাজিক কাঠামো দলীয় আনুগত্যে বিভক্ত হবে না। যোগ্যতা ও সততার পরিবর্তে দলীয় পরিচয় যদি অগ্রাধিকার পায়, তাহলে সেই রাষ্ট্র কেবল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্যই নিরাপদ থাকে, সবার জন্য নয়। একটি টেকসই বাংলাদেশ গড়তে হলে দলীয়করণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোনো স্থান থাকতে পারে না। ধর্ম, জাতিসত্তা কিংবা মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে কাউকে আক্রমণের শিকার হতে হবে এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ তখনই নিরাপদ হবে, যখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষও সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করতে পারবে। মন্দির, গির্জা কিংবা উপাসনালয় রক্ষা করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি তাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের নৈতিক বাধ্যবাধকতা।
নিরাপদ বাংলাদেশ মানে জঙ্গিবাদের উত্থান রোধ করা। ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে সহিংসতা ছড়ানো কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ কোনোভাবেই দেওয়া যায় না। তবে জঙ্গিবাদ দমনের নামে নির্বিচার দমন-পীড়নও নিরাপত্তার পথ নয়। প্রকৃত নিরাপত্তা আসে ন্যায়বিচার, শিক্ষার বিস্তার ও সচেতনতার মাধ্যমে।
একই সঙ্গে, নিরীহ আলেম-উলামাদের ওপর নিপীড়ন কোনো সুস্থ রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না। মতাদর্শের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তা যেন কখনোই অন্যায় নির্যাতনের কারণ না হয়। যারা শান্তিপূর্ণভাবে ধর্মচর্চা ও সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রাখছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ধর্মীয় স্বাধীনতা ছাড়া কোনো দেশ প্রকৃত অর্থে নিরাপদ হতে পারে না।
গণতন্ত্রের প্রাণ হলো ভিন্নমত। বিরোধী দলের মত প্রকাশের অধিকার রুদ্ধ হলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে অগণতান্ত্রিক হয়ে পড়ে। নিরাপদ বাংলাদেশ মানে এমন দেশ, যেখানে সরকারের সমালোচনা করলে কাউকে ভয় পেতে হবে না। যেখানে বিরোধী মতকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে দেখা হবে না। রাজনৈতিক সহাবস্থান ও সহনশীলতা ছাড়া রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে নিরাপত্তা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। নিরাপদ বাংলাদেশ মানে এমন দেশ, যেখানে আইন সবার জন্য সমান। ক্ষমতাবান হোক বা সাধারণ মানুষ অপরাধ করলে বিচার হবেই। বিচারহীনতার সংস্কৃতি যতদিন থাকবে, ততদিন নিরাপত্তা কেবল একটি শ্লোগান হয়েই থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপত্তা যেন কোনো নির্দিষ্ট দল, গোষ্ঠী বা মতাদর্শের জন্য সীমাবদ্ধ না থাকে। রাষ্ট্র যদি কেবল ক্ষমতাসীনদের জন্য নিরাপদ হয়, তাহলে সেটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। প্রকৃত নিরাপত্তা আসে তখনই, যখন কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, আলেম, সংখ্যালঘু, নারী—সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করে।
বাংলাদেশ কার কাছে নিরাপদ ,এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আমাদের রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর। যদি আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে থাকবে না চাঁদাবাজি, থাকবে না দলবাজি, হবে না সংখ্যালঘু নির্যাতন, হবে না জঙ্গিদের উত্থান, হবে না নিরীহ আলেম-উলামার ওপর নিপীড়ন, এবং বিরোধী মত প্রকাশে থাকবে না কোনো বাধা তাহলেই বাংলাদেশ হবে সবার জন্য নিরাপদ।
শেষ পর্যন্ত বলতে হয়, নিরাপদ বাংলাদেশ কোনো একক সিদ্ধান্তে তৈরি হয় না। এটি গড়ে ওঠে ন্যায়বিচার, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে। রাষ্ট্র যদি তার সব নাগরিককে সমান চোখে দেখে, তাহলেই এই দেশ সত্যিকার অর্থে নিরাপদ হয়ে উঠবে।