সম্পাদক : মুহাম্মদ জাকির হোসাইন
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, ততই রাজনীতিবিদদের আচরণে এক আশ্চর্য রূপান্তর লক্ষ্য করা যায়। বছরের পর বছর যাদের খোঁজ পাওয়া যায় না, তারাই হঠাৎ করে মানুষের সবচেয়ে আপনজন হয়ে ওঠেন। ভোটের জন্য প্রার্থী তখন দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান, বিনয়ের হাসি মুখে নিয়ে কুশল বিনিময় করেন, মানুষের দুঃখ-কষ্ট শুনে সহানুভূতির ভান করেন। মনে হয়, জনগণই যেন তাদের জীবনের একমাত্র অগ্রাধিকার। কিন্তু এই সৌজন্য, এই আন্তরিকতা সবই কি তবে কেবল ভোট আদায়ের কৌশল?
বাস্তবতা হলো, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচন অনেকটাই এক ধরনের নাটক। ভোটের আগে প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দেওয়া হয় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ। কিন্তু ভোট শেষ হলেই সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাতাসে মিলিয়ে যায়। যিনি গতকাল পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ঘরে বসে চা খেয়েছেন, তিনিই আজ প্রটোকল, দালাল আর ক্ষমতার দেয়ালে ঘেরা এক অদৃশ্য মানুষ। জনগণের সঙ্গে তার সম্পর্ক যেন ভোট বাক্সে সিল মারার সঙ্গেই শেষ।
এই আচরণ শুধু অমানবিকই নয়, এটি গণতন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা। কারণ গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নেওয়া নয়, ভোটের পর জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা। অথচ আমাদের জনপ্রতিনিধিদের বড় একটি অংশ মনে করেন, ক্ষমতায় পৌঁছালেই জনগণের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। তারা ভুলে যান যে ভোটকে হাতিয়ার করে তারা ক্ষমতায় এসেছেন, সেই ভোটদাতাদের প্রতিই তাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
নির্বাচনের সময় একজন ভোটারের একটি ভোটের যে মূল্য দেখা যায়, নির্বাচনের পর সেই ভোটারই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে অবহেলিত। তার অভিযোগ শোনার কেউ নেই, সমস্যার সমাধানে কেউ এগিয়ে আসে না। জনপ্রতিনিধির দপ্তরের দরজা সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় বন্ধই থাকে। আর যদি কোনোভাবে দেখা পাওয়াও যায়, তখন আচরণে থাকে ঔদ্ধত্য, কথায় থাকে বিরক্তি। নির্বাচনের সময়কার সেই মিষ্টি ভাষা আর বিনয়ী ভঙ্গি কোথায় হারিয়ে যায় এই প্রশ্নের উত্তর আজও অধরা।
এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত চরিত্রের সমস্যা নয়, এটি একটি কাঠামোগত সংকট। আমাদের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘ভোটের আগে জনগণ, ভোটের পর ক্ষমতা’ এই নীতিই কার্যকর। উন্নয়নের নামে চলে লোক দেখানো কাজ, আর প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে যায় অবহেলার অন্ধকারে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহার ক্রমেই জনগণের বিশ্বাসকে চূর্ণ করছে।
এর সবচেয়ে ভয়াবহ ফল হলো মানুষের রাজনীতির প্রতি অনাস্থা। সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে ভোট দিয়ে আসলে কিছুই বদলায় না। এই হতাশা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। কারণ যখন নাগরিকরা ভোটকে অর্থহীন মনে করে, তখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে এখানে একটি অস্বস্তিকর সত্য স্বীকার করতেই হয় ,এই পরিস্থিতির জন্য কিছুটা দায় আমাদের নিজেদেরও। আমরা ভোট দেওয়ার পর খুব কম ক্ষেত্রেই জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির মুখোমুখি করি। নির্বাচনের পর তাদের কাজের হিসাব চাইতে আমরা অভ্যস্ত নই। ফলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। জনগণের নীরবতাই অনেক সময় তাদের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়।
তবুও মূল দায়িত্ব জনপ্রতিনিধিদেরই। কারণ ক্ষমতা মানেই দায়িত্ব। ভোটের সময় যে ভালো ব্যবহার দেখানো হয়, যদি তা নির্বাচনের পরেও বজায় থাকত, তবে রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা অনেকটাই ফিরে আসত। জনগণ ভিক্ষুক নয়, তারা অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক। তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার কোনো দয়া নয়, এটি একজন জনপ্রতিনিধির ন্যূনতম কর্তব্য।
নির্বাচন কোনো একদিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি জনগণের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি। সেই চুক্তি ভঙ্গ করলে রাজনীতি শুধু নৈতিকভাবে নয়, ঐতিহাসিকভাবেও দেউলিয়া হয়ে পড়ে। ভোটের আগে নাটক আর ভোটের পর নীরবতা—এই দ্বিচারিতা বন্ধ না হলে গণতন্ত্র কেবল কাগজেই টিকে থাকবে, বাস্তবে নয়।
শেষ কথা একটাই ভোটের সময়কার ভালো ব্যবহার যদি শুধুই অভিনয় হয়, তবে তা জনগণের সঙ্গে নির্মম প্রতারণা। রাজনীতিকে যদি সত্যিই জনসেবার মাধ্যম বানাতে হয়, তবে নির্বাচনের পরেই প্রার্থীদের মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি দেখা যাওয়ার কথা। অন্যথায় ইতিহাস একদিন প্রশ্ন তুলবেই ক্ষমতায় বসে তারা জনগণকে কতটা ভুলে গিয়েছিল।