দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা মৌলভীবাজার। চা শিল্প, প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা, পর্যটন সম্ভাবনা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সব মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে জেলার অবদান কম নয়। তবু জাতীয় মন্ত্রিসভায় মৌলভীবাজার থেকে কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর অনুপস্থিতি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। কেন এই জেলায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নেই এ প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক ও নাগরিক মহলে সমানভাবে উচ্চারিত হচ্ছে।
মৌলভীবাজার জেলার চারটি সংসদীয় আসন রয়েছে ,মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী), মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া), মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) এবং মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ)। বিভিন্ন সময়ে এসব আসন থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করলেও মন্ত্রিসভায় জেলার স্থায়ী বা প্রভাবশালী উপস্থিতি দেখা যায়নি। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় সমীকরণ, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আস্থা, জ্যেষ্ঠতা এবং জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব—এসব বিষয় মন্ত্রিত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক সময় নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দলীয় কাঠামোয় সক্রিয় থাকলেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যথেষ্ট প্রভাব তৈরি করতে পারেন না।
আরেকটি কারণ হিসেবে উঠে আসে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ বিভাজনের বিষয়টি। জেলার রাজনীতিতে একাধিক প্রভাবশালী গ্রুপ সক্রিয় থাকায় ঐক্যবদ্ধ লবিংয়ের ঘাটতি দেখা যায়। ফলে মন্ত্রিসভা গঠনের সময় জেলার পক্ষে শক্ত অবস্থান তৈরি হয় না বলে মনে করেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা। অন্যদিকে, সরকার গঠনের সময় আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা, জোট রাজনীতি, নারীর প্রতিনিধিত্ব কিংবা সংখ্যালঘু ও পেশাজীবী কোটার মতো নানা বিবেচনাও থাকে। সেই তুলনায় মৌলভীবাজার কখনও কখনও অগ্রাধিকার তালিকায় পিছিয়ে পড়ে।
তবে শুধু রাজনৈতিক সমীকরণই নয়, উন্নয়ন বাস্তবতাও আলোচনায় রয়েছে। চা শিল্পনির্ভর শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ অঞ্চল, প্রবাসী অধ্যুষিত কুলাউড়া, সীমান্তঘেঁষা বড়লেখা ও জুড়ী—প্রতিটি এলাকাই নিজস্ব সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ বহন করে। পর্যটনকেন্দ্র লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত কিংবা হাকালুকি হাওরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং শিল্পায়নে প্রত্যাশিত গতি আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের একটি অংশ মনে করে, মন্ত্রিসভায় জেলার প্রতিনিধিত্ব থাকলে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বাড়তে পারত।
অন্যদিকে, কিছু রাজনৈতিক নেতার মতে, উন্নয়ন নির্ভর করে প্রশাসনিক দক্ষতা ও পরিকল্পনার ওপর; মন্ত্রী না থাকলেও সঠিক উদ্যোগ থাকলে উন্নয়ন সম্ভব। তারা বলেন, মন্ত্রণালয়ে প্রতিনিধিত্ব গুরুত্বপূর্ণ হলেও একমাত্র শর্ত নয়। জাতীয় বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় যথাযথ প্রস্তাবনা উপস্থাপন এবং তা বাস্তবায়নে তদারকি জোরদার করাই মূল বিষয়।
তবে জনমতের আরেকটি অংশ বলছে, প্রতীকী প্রতিনিধিত্বেরও আলাদা গুরুত্ব আছে। একটি জেলা থেকে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী থাকলে স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা ও সমস্যাগুলো সরাসরি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়। এতে প্রশাসনিক সমন্বয়ও সহজ হয়। বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা, প্রবাসী কল্যাণ, কৃষি ও চা শিল্পের উন্নয়ন এসব ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জেলার কণ্ঠ থাকা দরকার বলে তারা মনে করেন।
সব মিলিয়ে মৌলভীবাজারে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী না থাকার প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং উন্নয়ন ও প্রতিনিধিত্বের সঙ্গেও জড়িত। আগামী জাতীয় নির্বাচন ও মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের আলোচনায় এ বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। জেলার নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা যোগ্যতা, দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে মৌলভীবাজার থেকেও কেউ জাতীয় মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন এবং জেলার সম্ভাবনাকে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরবেন।







