দেশের চিত্র প্রতিবেদন
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মনসুর রহমান ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং মাতা জাহানারা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। শৈশব থেকেই তিনি মেধাবী ও শৃঙ্খলাপরায়ণ ছিলেন।
জিয়াউর রহমান তার শিক্ষাজীবন শুরু করেন বগুড়ায়, পরে করাচিতে পড়াশোনা করেন। তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। সামরিক জীবনে তিনি ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণের পরিচয় দেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি তখন চট্টগ্রামে অবস্থানরত একজন সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন, যা মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে তিনি মুক্তিবাহিনীর সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন।
স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি ধীরে ধীরে দেশের নেতৃত্বে আসেন। ১৯৭৭ সালে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন এবং রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করেন। তার উদ্যোগে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীতে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি কৃষি ও শিল্প উন্নয়নে গুরুত্ব দেন। গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন এবং স্বনির্ভরতা অর্জনের ওপর জোর দেন। তার সময়ে গার্মেন্টস শিল্পের ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং বিদেশে শ্রমশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আয়ের পথ উন্মুক্ত হয়। তিনি অবকাঠামো উন্নয়ন, সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পররাষ্ট্রনীতিতে জিয়াউর রহমান ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি মুসলিম বিশ্বসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করেন। তার উদ্যোগে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করে।
ব্যক্তিগত জীবনে জিয়াউর রহমান ছিলেন সাদাসিধে ও পরিশ্রমী। তার স্ত্রী খালেদা জিয়া পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। তাদের দুই পুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো রাজনীতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে যুক্ত ছিলেন।
তারেক রহমান বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানের সময় জিয়াউর রহমান নিহত হন। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বড় শূন্যতা সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে তাকে ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
জিয়াউর রহমানের জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তিনি একদিকে মুক্তিযুদ্ধের সাহসী যোদ্ধা, অন্যদিকে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল এবং তার নীতিগুলো এখনও বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
তার অবদান ও উত্তরাধিকার নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ থাকলেও, তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।