রিয়াদ আহমেদ
রাজনীতি মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও কল্যাণ নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু যখন এই রাজনীতি সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন তা আর মানুষের মুক্তির পথ দেখায় না; বরং সমাজকে অস্থিতিশীল করে তোলে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সহিংস রাজনীতি কখনোই টেকসই উন্নয়ন বা স্থায়ী সমাধান বয়ে আনতে পারেনি। তাই আজ আমাদের স্পষ্ট করে বলতে হয়—সহিংস রাজনীতি চাই না।
সহিংস রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক সংঘর্ষ, হরতাল, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিরীহ নাগরিক, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। স্কুল বন্ধ থাকে, পরীক্ষা পিছিয়ে যায়, হাসপাতাল পর্যন্ত নিরাপদ থাকে না। মানুষের জীবিকা ব্যাহত হয়, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ এসব সহিংসতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনো প্রত্যক্ষ দায় থাকে না। রাজনীতির নামে এই ভোগান্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সহিংস রাজনীতি গণতন্ত্রের মূল চেতনাকেও ধ্বংস করে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো মত প্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। কিন্তু সহিংসতা সেখানে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে। বিরোধী মত দমন হয়, যুক্তির বদলে শক্তির ব্যবহার শুরু হয়। ফলে রাজনীতি আদর্শচ্যুত হয়ে ক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত হয়, যা সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
তরুণ সমাজ সহিংস রাজনীতির আরেকটি বড় শিকার। অনেক সময় রাজনৈতিক স্বার্থে তরুণদের ব্যবহার করা হয় হাতিয়ার হিসেবে। পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ গঠনের সময় তারা জড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ, মামলা ও সহিংস কর্মকাণ্ডে। এতে একদিকে তাদের জীবন নষ্ট হয়, অন্যদিকে দেশ হারায় সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ। একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সহিংসতার পথে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই দায়িত্বশীল রাজনীতি হতে পারে না।
সহিংস রাজনীতির কারণে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশকে তখন অস্থিতিশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। বিনিয়োগ কমে যায়, উন্নয়নের গতি শ্লথ হয়। ফলে রাজনৈতিক সহিংসতার নেতিবাচক প্রভাব শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, বহির্বিশ্বেও বিস্তৃত হয়।
এর বিকল্প কী? বিকল্প হলো সহনশীল, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি। মতপার্থক্য থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মতভেদ মীমাংসা করতে হবে সংলাপ, আলোচনা ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সহিংসতা পরিহার করে আদর্শ ও কর্মসূচির রাজনীতিতে ফিরে যাওয়া। রাষ্ট্রকেও আইনের শাসন নিশ্চিত করে সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, সহিংস রাজনীতি কোনো সমাধান নয়—এটি একটি সমস্যা। একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে আমাদের সবাইকে একসাথে বলতে হবে: আমরা ভয় নয়, যুক্তি চাই; ধ্বংস নয়, উন্নয়ন চাই; সহিংস রাজনীতি নয়, শান্তির রাজনীতি চাই।