সাদা চুল কালো করতে খেযাব (চুলে রং) ব্যবহার করা ইসলামে একটি আলোচিত বিষয়। এ বিষয়ে কুরআন-হাদিস ও সাহাবিদের আমল থেকে বিভিন্ন ধরনের মতামত পাওয়া যায়। বিশেষ করে কালো রং ব্যবহার করা যাবে কি না—এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এই আর্টিকেলে আমরা দলিলসহ বিষয়টি বিশ্লেষণ করবো।
প্রথমত, চুলে রং করা নিজেই ইসলামে জায়েজ। এ বিষয়ে হাদিসে উৎসাহও দেওয়া হয়েছে। সুনান আবু দাউদ এ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে, ইহুদী ও খ্রিস্টানরা চুল রং করে না, তাই তোমরা তাদের বিরোধিতা করো। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সাদা চুল পরিবর্তন করা বৈধ, বরং তা একটি ভালো কাজ হিসেবে বিবেচিত।
তবে মূল বিতর্কটি হলো কালো রং নিয়ে। সহীহ মুসলিম এ একটি হাদিসে এসেছে: “তোমরা সাদা চুল পরিবর্তন করো, কিন্তু কালো রং থেকে বিরত থাকো।” এই হাদিসের ভিত্তিতে অনেক আলেম বলেছেন যে, সম্পূর্ণ কালো রং ব্যবহার করা নিষিদ্ধ বা অন্তত মাকরূহ তাহরিমি। তারা মনে করেন, এটি এক ধরনের প্রতারণা, বিশেষ করে বয়স লুকানোর ক্ষেত্রে।
কিন্তু অন্যদিকে, এমন কিছু দলিলও রয়েছে যা থেকে বোঝা যায় যে কালো রং সম্পূর্ণ হারাম নয়। উদাহরণস্বরূপ, কিছু সাহাবি কালো রং ব্যবহার করতেন বলে বর্ণিত আছে। হাসান ইব্ন আলী (রা.) এবং হোসাইন ইব্ন আলী (রা.)-এর ব্যাপারে বর্ণনা পাওয়া যায় যে তারা চুলে কালো রং ব্যবহার করেছেন। এই বর্ণনাগুলো মুসান্নাফ ইব্ন আবি শায়বাহ এর মতো গ্রন্থে পাওয়া যায়। সাহাবিদের আমল ইসলামী শরিয়তে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই অনেকে যুক্তি দেন, যদি কালো রং সম্পূর্ণ হারাম হতো, তাহলে সম্মানিত সাহাবিরা তা ব্যবহার করতেন না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিশেষ পরিস্থিতিতে কালো রং ব্যবহারের অনুমতি। কিছু বর্ণনায় এসেছে যে, জিহাদের সময় মুসলিমদেরকে তরুণ দেখানোর জন্য কালো রং ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই ধরনের বর্ণনা সুনান আবু দাউদ সহ অন্যান্য হাদিস গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। এখান থেকে কিছু আলেম বলেন, কালো রং মূলত নিষিদ্ধ নয়; বরং পরিস্থিতি ও উদ্দেশ্যের উপর নির্ভর করে এর হুকুম পরিবর্তিত হতে পারে।
এখানে আলেমদের মধ্যে মূলত তিনটি মত পাওয়া যায়। প্রথম মত অনুযায়ী, কালো রং ব্যবহার করা হারাম। তারা সহিহ মুসলিমের হাদিসকে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা হিসেবে গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় মত হলো, এটি হারাম নয় বরং মাকরূহ—অর্থাৎ অপছন্দনীয়, কিন্তু ব্যবহার করলে গুনাহ হবে না। তৃতীয় মত অনুযায়ী, কিছু শর্তসাপেক্ষে কালো রং ব্যবহার করা জায়েজ। বিশেষ করে যদি প্রতারণার উদ্দেশ্য না থাকে, বরং স্বামী-স্ত্রীর সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য হয়, তাহলে তা অনুমোদিত হতে পারে।
এই তৃতীয় মতকে সমর্থন করেছেন কিছু বিখ্যাত আলেমও। যেমন ইব্ন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এবং ইব্ন আল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ । তারা বলেন, সাহাবিদের আমল এবং বিশেষ পরিস্থিতির অনুমতি থেকে বোঝা যায় যে বিষয়টি একেবারে নিষিদ্ধ নয়। বরং এর মধ্যে কিছুটা ছাড় রয়েছে।
তবে অধিকাংশ আলেমের মত হলো, নিরাপদ পথ হলো কালো রং এড়িয়ে চলা। কারণ নিষেধাজ্ঞার হাদিসটি সহিহ এবং স্পষ্ট। তাই তারা মেহেদি, লাল, হলুদ বা বাদামি রং ব্যবহারকে বেশি উত্তম মনে করেন।
সবশেষে বলা যায়, চুলে খেযাব ব্যবহার করা ইসলামে জায়েজ এবং সুন্নাহ দ্বারা সমর্থিত। কিন্তু কালো রং ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। এটি সম্পূর্ণ হারাম কি না এ বিষয়ে মতভেদ থাকলেও, অধিকাংশ আলেম এটিকে অপছন্দনীয় বা সীমিতভাবে অনুমোদিত বলেছেন। তাই একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে এমন রং ব্যবহার করা উত্তম যা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
এভাবে দলিল ও আলেমদের মতামত বিবেচনা করলে বোঝা যায়, ইসলামে এই বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করাই সবচেয়ে ভালো।