ডেস্ক রিপোর্ট
সিলেট বিভাগের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের সক্রিয় রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে নারী, শিশু ও শ্রমজীবী মানুষকে পাচার করা হচ্ছে এমন তথ্য উঠে এসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, কঠোর নজরদারি ও একাধিক অভিযানের পরও এই অবৈধ কার্যক্রম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। বরং সীমান্তের দুর্গম এলাকা এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে পাচারকারীরা সুসংগঠিত সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত তিন বছরে সিলেট বিভাগ থেকে প্রায় ২২০০ জনকে পাচার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৫০০ এর বেশি ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং কয়েকশ’ ব্যক্তি এই অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছে।
বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, জকিগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও বিয়ানীবাজার সীমান্ত দিয়ে মূলত পার্শ্ববর্তী দেশে নারী ও শিশু পাচারের ঘটনা বেশি ঘটে। অন্যদিকে, বিমানবন্দর ব্যবহার করে ভিজিট ভিসার আড়ালে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে শ্রমিক পাচারের ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, এই পাচার চক্রে প্রভাবশালী ব্যক্তি, দালাল এবং কিছু অসাধু কর্মকর্তা জড়িত রয়েছে। একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়, অথচ তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত প্রতারণার শিকার হন।
এই চক্রের সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তিকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি ও রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানের আড়ালে এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
মানব পাচারের একটি বড় অংশ সংঘটিত হয় লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ রুটে। এই পথে অনেক ভুক্তভোগী জিম্মি, নির্যাতন কিংবা মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনাও এই ঝুঁকির ভয়াবহতা তুলে ধরেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, মানব পাচার প্রতিরোধে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে পাচারকারীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, অর্থনৈতিক লোভ এবং ভুক্তভোগীদের অসচেতনতা এই অপরাধ দমনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে, সিলেট বিভাগীয় মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে শত শত মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তবে সাক্ষীর অভাব ও প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতার কারণে দোষীদের শাস্তির হার তুলনামূলকভাবে কম।
সম্প্রতি ঈদ উপলক্ষে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হলে কয়েকজন নারী, পুরুষ ও শিশুকে পাচারের সময় আটক করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, কিছু চক্র নারীদের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে সীমান্ত পার করে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মানব পাচার থেকে অর্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। এতে কিছু অনিবন্ধিত ট্রাভেল এজেন্সির সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই অপরাধ বন্ধ করতে হলে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দালাল চক্র ভেঙে ফেলা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোও সময়ের দাবি।
সিলেটের পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, মানব পাচার রোধে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।