দুর্নীতিতে অসুস্থ দেশের চিকিৎসা খাত
অনলাইন ডেস্ক
সুমাইয়া মাহমুদ একজন সরকারি চাকরিজীবী। কিছুদিন আগে হঠাৎ করেই পেটের সমস্যায় ভুগতে শুরু করেন তিনি। অসুস্থ বোধ করায় তিনি যান একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা করলেন মাত্র এক মিনিটের মতো। এরপর কোনো বিস্তারিত প্রশ্ন ছাড়াই প্রেসক্রিপশন লেখা শুরু করলেন।
হঠাৎ করে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ছাপা কাগজ বের করে তাতে থাকা প্রায় সব পরীক্ষার নামের পাশে টিকচিহ্ন দিয়ে দিলেন। কাগজটি সুমাইয়ার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এই পরীক্ষাগুলো করিয়ে আনুন।” শুধু তাই নয়, কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করাতে হবে, সেটিও নির্দিষ্ট করে দিলেন। শেষে মুচকি হেসে যোগ করলেন, “ওখানে করলে ১০ শতাংশ ডিসকাউন্ট পাবেন।”
বিস্মিত সুমাইয়া প্রশ্ন করলেন, “আমার কি বড় কোনো সমস্যা?” চিকিৎসক গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “সব টেস্ট না করলে বলা যাবে না।” চিকিৎসকের কথায় ভরসা করে তিনি পরীক্ষা করাতে গেলেন। ২৬টি পরীক্ষার জন্য বিল এলো ৩৮ হাজার টাকা।
তিন দিন পর রিপোর্ট নিয়ে আবার চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি মাত্র দুই মিনিটে সব রিপোর্ট দেখে বললেন, “সব ঠিক আছে। গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা। ওষুধ খেলেই সেরে যাবে।”
তখনই সুমাইয়ার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তার সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার নামে তার কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়েছে।
সুমাইয়া একা নন। প্রতিদিন এভাবেই হাজারো রোগী প্রতারিত হচ্ছেন। চিকিৎসকের কাছে গেলেই রোগ নির্ণয়ের নামে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার দীর্ঘ তালিকা। বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে রোগীদের জন্য দেওয়া পরীক্ষার প্রায় ৭৮ শতাংশই অপ্রয়োজনীয়।
চিকিৎসক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ক এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। পপুলার, ল্যাবএইড, মেডিনোভা, ইবনে সিনার মতো বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর দেশজুড়ে রয়েছে অর্ধশতাধিক শাখা। এসব প্রতিষ্ঠানে নামকরা চিকিৎসকদের বসার ব্যবস্থা, চেম্বার ও জনবল সবই সরবরাহ করে সেন্টার কর্তৃপক্ষ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোনো কোনো চিকিৎসক মাসে কমিশন বাবদ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। কেউই এক লাখ টাকার কম পান না। বিনিময়ে রোগীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় একের পর এক অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, একটি পরীক্ষায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো ১৫০ থেকে ২০০ গুণ পর্যন্ত লাভ করে। যেমন—সিবিসি, আরবিএস, এস. ক্রিয়েটিনিন, এসজিপিটি, ইউরিন আর/ই-এর মতো রুটিন পরীক্ষার প্রকৃত খরচ গড়ে ১০–২০ টাকা হলেও রোগীর কাছ থেকে নেওয়া হয় ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত। এই অতিরিক্ত অর্থ মালিক ও চিকিৎসকের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।
এর ফলে একদিকে রোগ নির্ণয় পরিণত হয়েছে লাভজনক ব্যবসায়, অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সারা দেশে লাগামহীনভাবে গড়ে উঠছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার, যেখানে সরকারি হাসপাতালের নামকরা চিকিৎসকরাই প্রধান আকর্ষণ।
কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাফল্য নির্ভর করছে না পরীক্ষার মান বা সেবার ওপর—নির্ভর করছে সেখানে কতটা পরিচিত চিকিৎসক বসেন তার ওপর। এভাবেই দেশের স্বাস্থ্য খাতে রোগ নির্ণয় আজ এক ভয়াবহ বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে, যেখানে জিম্মি সাধারণ মানুষ, আর সরকার নীরব দর্শক।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন