1. desherchitrabd@gmail.com : Desher DesherChitra : Desher Chitra
বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০:১৯ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
৫ আগস্ট-পরবর্তী ৯১.৭% সহিংসতার সঙ্গে বিএনপি সম্পৃক্ত-টিআইবি এপস্টেইন ফাইল ও শেখ হাসিনার নাম: সত্য, গুজব ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ কার কাছে নিরাপদ বড়লেখা সীমান্তে মাদককারবারিদের তাণ্ডব, আসামি ধরতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা মৌলভীবাজার–রাজনগরকে আধুনিক নগরী গড়ার অঙ্গীকার: ১৫ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা মাওলানা আহমদ বিলালের মৌলভীবাজারে চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল অ্যান্টিভেনম, ঝুঁকিতে সাপদংশনের রোগীরা ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সতর্ক র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের নতুন নাম: ‘এসআইএফ’ পবিত্র শবেবরাত আজ ,সহীহ হাদিসের আলোকে এ রাতের গুরুত্ব ও করণীয় নির্বাচনী ব্যস্ততায় ঢিল, মাদক চক্রের দৌরাত্ম্য তুঙ্গে

উগ্রপন্থা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের উলামায়ে কেরামদের অবস্থান

  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫

দেশের চিত্র ডেস্ক

বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে উগ্রপন্থা একটি দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়। ধর্মের নামে সহিংসতা, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক—এমন মত বহু বছর ধরেই তুলে ধরে আসছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্র বক্তব্য, মব সহিংসতা এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় এই আলোচনাটি আরও জোরালোভাবে সামনে এসেছে।

বাংলাদেশের উলামায়ে কেরামদের বড় একটি অংশ স্পষ্টভাবে মনে করেন, ইসলাম শান্তি, সহনশীলতা ও ন্যায়বিচারের ধর্ম। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে তারা বলেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি ধর্মের নাম ব্যবহার করে সহিংসতা চালায়, কাউকে হত্যার আহ্বান জানায় কিংবা রাষ্ট্রীয় আইন অমান্য করে, তবে তা ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং এসব কর্মকাণ্ড ইসলামকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে এবং সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।

উলামায়ে কেরামদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে ‘খারেজি মানসিকতা’র প্রসঙ্গ। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইসলামের প্রাথমিক যুগেই কিছু গোষ্ঠী নিজেদের ব্যাখ্যাকেই একমাত্র সত্য মনে করে অন্য মুসলমানদের কাফির ঘোষণা করত এবং সহিংসতার পথ বেছে নিত। বাংলাদেশের আলেমরা মনে করেন, আধুনিক উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর চিন্তাধারা অনেকাংশেই সেই খারেজি প্রবণতার আধুনিক রূপ।

দেশের শীর্ষ আলেমদের মতে, তাকফির—অর্থাৎ কাউকে সহজে কাফির ঘোষণা করা—ইসলামে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। হাদিসে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে, কোনো মুসলমান অন্য মুসলমানকে কাফির বললে সেই অভিযোগ তার নিজের দিকেই ফিরে আসতে পারে। অথচ উগ্রপন্থীরা ভিন্নমতাবলম্বী মুসলমান, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষ কিংবা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে তাকফিরের চর্চা করছে, যা সমাজে চরম বিভাজন তৈরি করছে।

উলামায়ে কেরামরা আরও বলেন, ইসলাম কোনোভাবেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অনুমতি দেয় না। কেউ ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুললেও তার বিচার করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও আদালতের, কোনো ব্যক্তি বা জনতার নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী উল্লেখ করে তারা বলেন, তিনি কখনো মব তৈরি করে কাউকে শাস্তি দেননি; বরং সব ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা ও ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আলেমরা মনে করেন, উগ্রপন্থা বিস্তারের পেছনে ধর্মীয় অজ্ঞতা বড় ভূমিকা রাখে। কোরআন-হাদিসের খণ্ডিত ব্যাখ্যা, আরবি ভাষা ও ইসলামী ফিকহ সম্পর্কে অপর্যাপ্ত জ্ঞান এবং ইউটিউব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর তথাকথিত বয়ান থেকে অনেক তরুণ বিভ্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে আলেমরা সঠিক দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারের ওপর জোর দিচ্ছেন।

উলামায়ে কেরামদের মতে, ওয়াজ ও বয়ানে দায়িত্বশীলতা এখন সময়ের দাবি। তারা বলেন, কোনো বক্তা যদি উত্তেজনাকর ভাষা ব্যবহার করে, বিদ্বেষ ছড়ায় বা সহিংসতার ইঙ্গিত দেয়, তবে তা শুধু আইনগত অপরাধই নয়, দ্বীনি দিক থেকেও গুনাহ। একজন আলেমের দায়িত্ব মানুষকে হেদায়াতের পথে ডাকা, বিভক্তি ও রক্তপাতের দিকে ঠেলে দেওয়া নয়।

বিভিন্ন আলেম পরিষদ ও ইসলামী সংগঠনের নেতারা প্রকাশ্যে বলেছেন, আইএস, আল-কায়েদা কিংবা এ ধরনের সশস্ত্র সংগঠন ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে না। তারা এসব গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডকে ‘ফিতনা’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এরা মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসব মতাদর্শ আমদানি করা দেশের শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় সংস্কৃতির জন্য হুমকি।

বাংলাদেশের উলামায়ে কেরামরা বারবার স্মরণ করিয়ে দেন, এ দেশের ইসলামী ঐতিহ্য সুফিবাদ, সহনশীলতা ও সহাবস্থানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। হাজার বছর ধরে এ ভূখণ্ডে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানরা পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। উগ্রপন্থী মতাদর্শ এই ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং বিদেশি প্রভাবিত বলে মনে করেন অনেক আলেম।

রাষ্ট্র ও সমাজের ভূমিকা নিয়েও উলামায়ে কেরামরা মতামত দিয়েছেন। তারা বলেন, উগ্রপন্থা দমনে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও গণমাধ্যম—সব ক্ষেত্র থেকেই উগ্র চিন্তার বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে।

আলেমদের একটি বড় অংশ মনে করেন, তরুণদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে হবে এবং যুক্তির মাধ্যমে উত্তর দিতে হবে। প্রশ্নকে দমন করলে বা কেবল নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে মোকাবিলা করলে উগ্রপন্থা আরও গোপনে বিস্তার লাভ করতে পারে। তাই খোলা আলোচনা, সঠিক ব্যাখ্যা ও সহনশীল পরিবেশ তৈরির ওপর তারা গুরুত্ব দেন।

নারী, সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নিরাপত্তার প্রশ্নেও উলামায়ে কেরামদের অবস্থান স্পষ্ট। তারা বলেন, ইসলাম নারীকে সম্মান দিয়েছে এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। ধর্মের নামে নারী হয়রানি, সংখ্যালঘু নির্যাতন বা ভিন্নমত দমনের কোনো বৈধতা ইসলামে নেই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্র বক্তব্য প্রসঙ্গে আলেমরা সতর্ক করেন, একটি পোস্ট বা ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। তাই অনলাইনে কথা বলার ক্ষেত্রেও তাকওয়া ও দায়িত্ববোধ জরুরি। তারা বলেন, “কলমের জিহাদ” মানে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলা, ঘৃণা ছড়ানো নয়।

উগ্রপন্থা দমনে আলেমদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো—ধর্মীয় শিক্ষার আধুনিকায়ন। কোরআন-হাদিসের পাশাপাশি ইতিহাস, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমসাময়িক বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান থাকলে একজন শিক্ষার্থী উগ্র ব্যাখ্যার ফাঁদে সহজে পড়বে না বলে তারা মনে করেন।

সবশেষে উলামায়ে কেরামদের সম্মিলিত বক্তব্য হলো, ইসলাম শান্তির ধর্ম এবং বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ইসলামী ধারা বজায় রাখতে হলে উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রত্যেক আলেমের নৈতিক দায়িত্ব। ধর্মের নামে সহিংসতা যারা ছড়ায়, তারা ইসলামের নয়—বরং ইসলামের শত্রু। এই বার্তাই তারা মসজিদ, মাদ্রাসা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চান।

Share this Post in Your Social Media

এই ধরনের আরও খবর
Copyright © 2026, সাপ্তাহিক দেশের চিত্র. All rights reserved.
Theme Customized By BreakingNews