সম্পাদক: মুহাম্মদ জাকির হোসাইন
একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা অবকাঠামোর চাকচিক্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের কতটা নিরাপত্তা ও মর্যাদা দিতে পারে, সেটাই প্রকৃত মানদণ্ড।
সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা তাই কোনো করুণা নয়—এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার, একটি নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিশ্বের নানা প্রান্তে আজও সংখ্যালঘুরা ভয়ের মধ্যে বসবাস করছে।
এই বাস্তবতায় ইসলামের শিক্ষা আমাদের সামনে এক গভীর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে, যা শুধু মুসলমানদের জন্য নয়—সমগ্র মানবজাতির জন্য কল্যাণকর।
ইসলাম কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় মতবাদ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। কুরআনের ভাষায়, আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যেন তারা পরস্পরকে চিনতে পারে—ঘৃণা করতে নয়।
এই বৈচিত্র্যই মানব সমাজের সৌন্দর্য। সুতরাং সংখ্যালঘুদের প্রতি অবিচার করা মানে শুধু মানবিক মূল্যবোধের লঙ্ঘন নয়, বরং ইসলামের মৌলিক শিক্ষার বিরোধিতা করা।
ইসলামের ইতিহাসে সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রশ্নে সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও শাসনব্যবস্থা।
মদিনা সনদ ছিল বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধানগুলোর একটি, যেখানে মুসলমান, ইহুদি ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ও নিরাপত্তা সুস্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল। সেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা, জান-মালের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। এটি প্রমাণ করে—ইসলাম রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেও সংখ্যালঘুদের দমনে নয়, বরং সহাবস্থানে বিশ্বাস করে।
নবী (সা.)-এর একটি হাদিস আমাদের হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়:
“যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিমের ওপর জুলুম করবে, তার অধিকার ক্ষুণ্ন করবে, তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপাবে বা তার কাছ থেকে জোর করে কিছু নেবে—আমি কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে দাঁড়াব।”
এই হাদিস কেবল ধর্মীয় উপদেশ নয়, এটি এক শক্তিশালী নৈতিক ঘোষণা। এখানে সংখ্যালঘুদের প্রতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অবস্থান স্পষ্ট।
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি ইসলাম এত স্পষ্টভাবে সংখ্যালঘু নিরাপত্তার কথা বলে, তবে কেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কিছু সমাজে সংখ্যালঘুরা আজও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে? এর উত্তর ধর্মে নয়, বরং আমাদের ব্যর্থতায়।
আমরা অনেক সময় ধর্মকে ব্যবহার করি আবেগ উসকে দিতে, কিন্তু ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করি না। ধর্ম যখন নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তা নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে ওঠে—এটি ইসলামের নয়, মানুষের বিকৃতি।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, মন্দির বা গির্জা ভাঙচুর, জোরপূর্বক উচ্ছেদ—এসব শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, এগুলো ইসলামের নামকে কলঙ্কিত করে।
একজন সংখ্যালঘু নাগরিক যখন ভয়ে ঘুমাতে যায়, তখন সেটি শুধু তার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়—পুরো সমাজের ব্যর্থতা। ইসলাম আমাদের শেখায়, প্রতিবেশী যে ধর্মেরই হোক, তার নিরাপত্তা আমার দায়িত্ব। কুরআনে বলা হয়েছে, “একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা মানে পুরো মানবজাতিকে হত্যা করা।” এই আয়াতের আলোকে সংখ্যালঘুর রক্তও সমান পবিত্র।
আজকের বিশ্বে ইসলামোফোবিয়া যেমন একটি বাস্তব সমস্যা, তেমনি মুসলিম সমাজের ভেতর সংখ্যালঘু অবহেলার চর্চাও একটি কঠিন সত্য। এই দ্বৈত সংকট থেকে উত্তরণের পথ একটাই—ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ফিরে পাওয়া। শক্তির রাজনীতি নয়, ন্যায়ের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা। সংখ্যাগরিষ্ঠতার দম্ভ নয়, নৈতিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানেই শেষ নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থাকে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে নিরপেক্ষ ও কঠোর হতে হবে। অপরাধীর পরিচয় বা ধর্ম নয়—অপরাধই যেন বিচার্যের কেন্দ্র হয়।
ইসলাম বিচারকে অন্ধ হতে শেখায়; সেখানে আত্মীয়-পরিচিতির জায়গা নেই। হযরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে একজন ইহুদি নাগরিকের অধিকার রক্ষায় খলিফার নিজ হাতে বিচার নিশ্চিত করার ঘটনা আজও আমাদের পথ দেখায়।
সবচেয়ে বড় কথা, সামাজিক মনোভাব বদলাতে হবে। পাঠ্যবই, খুতবা, গণমাধ্যম ও পারিবারিক শিক্ষায় সংখ্যালঘুদের প্রতি সম্মান ও সহানুভূতির চর্চা জরুরি। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে—ভিন্ন বিশ্বাস মানেই শত্রু নয়। সহাবস্থানই শান্তির পথ।
সংখ্যালঘু নিরাপত্তা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর দাবি নয়; এটি ইসলামের নৈতিক পরীক্ষাও বটে। আমরা যদি সত্যিই ইসলামের অনুসারী হই, তবে আমাদের আচরণে তা প্রতিফলিত হতে হবে।
সংখ্যালঘুর চোখের পানি মুছে দেওয়া, তার পাশে দাঁড়ানো, তার অধিকার রক্ষা করা—এগুলোই ইসলামের বাস্তব প্রয়োগ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সহজ: আমরা কি সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে শক্তিশালী হতে চাই, নাকি ন্যায়বান হয়ে মহান হতে চাই? ইসলাম দ্বিতীয় পথটাই দেখায়। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের।