1. desherchitrabd@gmail.com : Desher DesherChitra : Desher Chitra
শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:৪০ অপরাহ্ন

মুসলমানদের কফি আবিষ্কার: ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য অধ্যায়

  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫

মুসলিম ঐতিহ্য

কফি আজকের বিশ্বে একটি দৈনন্দিন পানীয় হিসেবে মানুষের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন কফি পান করে কর্মক্ষমতা বাড়ায়, মেজাজ চাঙ্গা রাখে এবং সামাজিক ও পেশাগত জীবনকে গতিশীল করে তোলে। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে, এই জনপ্রিয় পানীয়টির যাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত মুসলিম বিশ্বের হাত ধরে। ইতিহাসে কফি আবিষ্কার, বিকাশ ও বিস্তারে মুসলমানদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি তাদের সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

কফির প্রাথমিক উৎস আফ্রিকার ইথিওপিয়া অঞ্চলে হলেও এর সংগঠিত ব্যবহার ও প্রসার ঘটে ইয়েমেনের মুসলিম সমাজে। ১৫ শতকের দিকে ইয়েমেনের সুফি সাধকরা কফিকে পানীয় হিসেবে গ্রহণ করেন, বিশেষত রাতভর ইবাদত, জিকির ও ধ্যানের সময় মনোযোগ ও সজাগতা বজায় রাখার জন্য। ধীরে ধীরে এটি মদ্যপানের একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে মুসলিম সমাজে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

ইতিহাসে কফি ‘কাহওয়াহ’ নামে পরিচিত ছিল। সে সময় কফি কেবল একটি পানীয়ই নয়, বরং একটি সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন শহরে গড়ে ওঠে ‘কাহওয়াহখানা’ বা কফি হাউস, যেখানে মানুষ একত্রিত হয়ে ধর্মীয় আলোচনা, সাহিত্যচর্চা, দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের আদান-প্রদান করত। এসব কফি হাউস মুসলিম সমাজে বিদ্বান, কবি ও সাধারণ মানুষের মিলনস্থলে পরিণত হয়।

কফির গুরুত্ব শুধু সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না; অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৫ ও ১৬ শতকে ইয়েমেন ও ওমানের মুসলিম ব্যবসায়ীরা কফি চাষ ও রপ্তানিকে একটি সুসংগঠিত বাণিজ্যিক শিল্পে রূপ দেন। লোহিত সাগর বন্দরনগরী মক্কা ও মোখা (Mocha) হয়ে কফি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং পরবর্তীতে ইউরোপে পৌঁছে যায়।

১৬ শতকের মধ্যে কফি মিসর, সিরিয়া, ইরান ও তুরস্কে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ওসমানীয় সাম্রাজ্যে কফি হাউস বা ‘কফেহানা’ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এখানে সাহিত্য, সংগীত, রাজনীতি এমনকি বৈজ্ঞানিক বিষয়েও আলোচনা হতো। এভাবে কফি মুসলিম সভ্যতায় চিন্তা, মতবিনিময় ও জ্ঞানচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে মুসলিম বিশ্বের মাধ্যমেই কফি ইউরোপে প্রবেশ করে। ভেনিস, লিসবন ও প্যারিসে প্রথম কফি হাউস গড়ে ওঠে মুসলিম কফি সংস্কৃতির অনুকরণে। ইউরোপীয়রা কফি পান করার রীতি ও কফি হাউস সংস্কৃতি নিজেদের সমাজে গ্রহণ করে, যা আধুনিক ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনেও প্রভাব ফেলে।

কফির প্রভাব মুসলিম সংস্কৃতি ও শিল্পক্ষেত্রেও সুস্পষ্ট। বহু প্রাচীন কফি হাউস ছিল কবি, লেখক ও দার্শনিকদের মিলনকেন্দ্র। কফি পান করে দীর্ঘ সময় লেখালেখি ও গবেষণায় মনোনিবেশ করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যা মুসলিম বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

সারসংক্ষেপে বলা যায়, মুসলমানরা কফিকে শুধু একটি পানীয় হিসেবে আবিষ্কার করেননি; বরং এটিকে সামাজিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ইয়েমেন ও ওসমানীয় সাম্রাজ্যের কফি চাষ, বাণিজ্য এবং কফি হাউস সংস্কৃতিই আজকের বৈশ্বিক কফি সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

কফি তাই শুধু একটি পানীয় নয়—এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানব সভ্যতার এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়, যার পেছনে মুসলিম বিশ্বের অবদান চিরস্মরণীয়।

Share this Post in Your Social Media

এই ধরনের আরও খবর
Copyright © 2026, সাপ্তাহিক দেশের চিত্র. All rights reserved.
Theme Customized By BreakingNews