1. desherchitrabd@gmail.com : Desher DesherChitra : Desher Chitra
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৫৮ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :

আমেরিকা–ইরান উত্তেজনার নেপথ্য কারণ: ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জটিল সমীকরণ

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬

দেশের চিত্র প্রতিবেদন

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এর বৈরিতা। সরাসরি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ না হলেও দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা, প্রক্সি সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ প্রায় চার দশক ধরে অব্যাহত। এই বৈরিতার নেপথ্যে রয়েছে আদর্শগত দ্বন্দ্ব, পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং জ্বালানি রাজনীতির জটিল সমীকরণ।

দ্বন্দ্বের সূচনা খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হয় ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব এ। বিপ্লবের মাধ্যমে পশ্চিমাপন্থী শাহ সরকারের পতন ঘটে এবং আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান নেয় এবং তেহরানে মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকট দুই দেশের সম্পর্ককে চরম অবনতির দিকে ঠেলে দেয়। এরপর থেকে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসই হয়ে ওঠে সম্পর্কের ভিত্তি।

পারমাণবিক কর্মসূচি ইস্যুতে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। ইরান দাবি করে তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আশঙ্কা করে এটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে অগ্রসর হতে পারে। ২০১৫ সালে জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA) স্বাক্ষরিত হলে সাময়িক স্বস্তি আসে। তবে ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেন এবং কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এতে তেহরান ওয়াশিংটন সম্পর্ক আবারও তীব্র সংকটে পড়ে।

মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়েও দুই দেশের সংঘাত প্রকট। ইরান সিরিয়া, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেন এ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মতো মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। ফলে দুই পক্ষ সরাসরি মুখোমুখি না হলেও প্রক্সি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের প্রভাবশালী সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি নিহত হলে পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইরান প্রতিশোধ হিসেবে ইরাকে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। যদিও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়নি, তবে ঘটনাটি দেখিয়ে দেয় যে সামান্য উসকানিতেই পরিস্থিতি বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

অর্থনৈতিক কারণও এই বৈরিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ দেশ। উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি রপ্তানির রুট, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাদের তেল রপ্তানি সীমিত করতে চায়, যাতে তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমে। অন্যদিকে ইরান নিষেধাজ্ঞাকে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে।

আদর্শগত দিক থেকেও দুই দেশের অবস্থান পরস্পরবিরোধী। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে গণতন্ত্র ও উদারনৈতিক মূল্যবোধের প্রবক্তা হিসেবে তুলে ধরে, আর ইরান তার ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে বিপ্লবের আদর্শের ধারক বলে মনে করে। এই আদর্শগত বিভাজন কূটনৈতিক সমঝোতাকে আরও কঠিন করে তোলে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ দুই পক্ষের জন্যই ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই উভয় দেশই সীমিত সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপের কৌশল অবলম্বন করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট। তবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির প্রেক্ষাপটে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দ্রুত বড় আকার ধারণ করতে পারে।

সব মিলিয়ে, আমেরিকা ইরান উত্তেজনার নেপথ্যে একক কোনো কারণ নেই; বরং ইতিহাস, আদর্শ, পারমাণবিক ইস্যু, আঞ্চলিক রাজনীতি ও জ্বালানি অর্থনীতি সবকিছুর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এই দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে কূটনৈতিক সংলাপ ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকার ওপর।

Share this Post in Your Social Media

এই ধরনের আরও খবর
Copyright © 2025-2026, সাপ্তাহিক দেশের চিত্র. All rights reserved.
Theme Customized By BreakingNews