দেশের চিত্র প্রতিবেদক
শবে বরাত (লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান) অর্থাৎ শা‘বান মাসের মধ্যরাত্রি মুসলিম সমাজে বহুল আলোচিত একটি রাত। অনেকেই এই রাতকে ভাগ্য নির্ধারণের রাত হিসেবে মনে করেন এবং বিভিন্ন ইবাদতে মশগুল হন। তবে একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই রাত সম্পর্কে কুরআন ও সহীহ হাদিস কী বলে, এবং কোন আমলগুলো শরিয়তসম্মত।
প্রথমেই বলা প্রয়োজন, কুরআনে শবে বরাতের নাম বা নির্দিষ্টভাবে এই রাতের কথা উল্লেখ নেই। কুরআনে যে “লাইলাতুম মুবারাকা” (বরকতময় রাত)-এর কথা এসেছে (সূরা আদ-দুখান: ৩), অধিকাংশ মুফাসসির একে লাইলাতুল কদর হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, শবে বরাত হিসেবে নয়।
তবে হাদিসের কিতাবে শা‘বান মাসের মধ্যরাত্রি সম্পর্কে কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হাদিসটি এসেছে ইবন মাজাহ ও অন্যান্য হাদিসগ্রন্থে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,“আল্লাহ তাআলা শা‘বান মাসের মধ্যরাত্রিতে (নিসফে শা‘বান) আসমানে অবতরণ করেন এবং বনু কালব গোত্রের ভেড়ার লোমের সংখ্যার চেয়েও বেশি মানুষকে ক্ষমা করে দেন।” (ইবন মাজাহ, হাদিস: ১৩৮৯)
এই হাদিসটি নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও, অনেক আলেম এটিকে ‘হাসান লিগাইরিহি’ (গ্রহণযোগ্য) হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। যেমন—ইমাম আলবানী (রহ.) এটিকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন। এর দ্বারা বোঝা যায়, এই রাতে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও ক্ষমার ঘোষণা রয়েছে, যদিও তা লাইলাতুল কদরের মতো সর্বসম্মত মর্যাদার নয়।
তবে একটি বিষয় এখানে স্পষ্টভাবে মনে রাখা জরুরি—রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে এই রাতে বিশেষ কোনো নামাজ, নির্দিষ্ট রাকাআত, সম্মিলিত ইবাদত, বা নির্দিষ্ট দোয়া প্রমাণিত নয়। সাহাবায়ে কেরাম থেকেও এ ধরনের বিশেষ আয়োজনের সহীহ প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই শবে বরাত উপলক্ষে আতশবাজি, হালুয়া-রুটি উৎসব, নির্দিষ্ট নিয়মে নামাজ পড়া বা একে ফরজ/সুন্নত হিসেবে প্রচার করা—এসব বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।
তবে এর মানে এই নয় যে, এই রাত একেবারেই গুরুত্বহীন। যেহেতু এই রাতে আল্লাহ তাআলার রহমত নাজিল হওয়ার কথা গ্রহণযোগ্য হাদিসে এসেছে, তাই একজন মুমিন ব্যক্তি নফল ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া এবং বিশেষভাবে তাওবা ও ইস্তিগফার করতে পারেন। এগুলো এমন আমল, যা যে কোনো রাতেই করা যায় এবং শরিয়তসম্মত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—হাদিসে এসেছে, এই রাতে আল্লাহ তাআলা মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারীকে ক্ষমা করেন না (মুসনাদ আহমাদ)। তাই শবে বরাত আমাদের জন্য একটি বড় সুযোগ—শিরক থেকে বেঁচে থাকা, হিংসা-বিদ্বেষ ত্যাগ করা এবং অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা।
শবে বরাত নিয়ে বাড়াবাড়ি যেমন ঠিক নয়, তেমনি একে পুরোপুরি অস্বীকার করাও ভারসাম্যপূর্ণ নয়। সহীহ ও গ্রহণযোগ্য হাদিসের আলোকে এই রাত আল্লাহর কাছে ফিরে আসার, ক্ষমা চাওয়ার এবং আত্মশুদ্ধির একটি সুন্দর সুযোগ ,যা আমাদের বিনয় ও ইখলাসের সঙ্গে কাজে লাগানো উচিত।