নিজস্ব প্রতিবেদক | মৌলভীবাজার
মৌলভীবাজার জেলায় সাপদংশনের ঘটনা প্রতিবছরই উদ্বেগজনক হারে ঘটে থাকলেও চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম না থাকায় ঝুঁকিতে পড়ছেন আক্রান্ত রোগীরা। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালসহ কয়েকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সীমিত পরিমাণ অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন গড়ে যে সংখ্যক সাপদংশনের রোগী চিকিৎসার জন্য আসেন, তার তুলনায় এই মজুত খুবই অপ্রতুল। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে দ্রুত সিলেট বা অন্য জেলায় রেফার করতে হচ্ছে, যা সময় ও ঝুঁকি—দুটোই বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, সাপদংশনের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা গেলে প্রাণরক্ষা সম্ভব হয়। কিন্তু হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম না থাকলে সেই ‘গোল্ডেন টাইম’ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে রোগীর অবস্থা দ্রুত জটিল হয়ে পড়ে, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।
মৌলভীবাজারের গ্রামীণ এলাকাগুলোতে এখনও সাপদংশনের পর ঝাড়ফুঁক বা কবিরাজের কাছে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। চিকিৎসাসেবা দেরিতে পাওয়ার পাশাপাশি অ্যান্টিভেনমের স্বল্পতাও পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। অনেক সময় পরিবারগুলো হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছালেও ওষুধের অভাবে সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, “আমাদের কাছে সীমিত সংখ্যক ভায়াল আছে। একেকজন রোগীর ক্ষেত্রে কখনও কখনও ১০–১৫ ভায়াল পর্যন্ত প্রয়োজন হয়। কিন্তু মজুত কম থাকায় আমরা বাধ্য হয়ে রোগীকে রেফার করি। এতে রোগীর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।”
জেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অ্যান্টিভেনম সরবরাহ কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সরবরাহ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বর্ষা মৌসুমে সাপদংশনের ঝুঁকি বেড়ে গেলেও সে অনুযায়ী আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করে, মৌলভীবাজারের মতো হাওর ও চা-বাগান অধ্যুষিত এলাকায় সাপদংশনের ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেশি। তাই এখানে অতিরিক্ত অ্যান্টিভেনম মজুত রাখা জরুরি। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসক ও নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অ্যান্টিভেনম বাড়ালেই হবে না, গ্রাম পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। সাপদংশনের পর দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত এলাকায় জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা জোরদার করার তাগিদও দিয়েছেন তারা।
সাপদংশনের মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতিতে সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে মৌলভীবাজারে অ্যান্টিভেনমের পর্যাপ্ত সরবরাহ এখন সময়ের দাবি। এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।