দেশের চিত্র ডেস্ক
বাংলাদেশে গত ১৭ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, এই সময়ে মোট ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ১৫৮ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত এবং ৭,০৮২ জন আহত হয়েছেন।
টিআইবি’র ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহিংসতার ৯১.৭ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে বিএনপির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ ২০.৭ শতাংশ, জামায়াতে ইসলামী ৭.৭ শতাংশ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১.২ শতাংশ ঘটনায় জড়িত ছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ১৭ মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সহিংসতা অব্যাহত ছিল। টিআইবি তথ্য মতে, ৫৫০টি সহিংসতার ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীরা সম্পৃক্ত ছিল, ১২৪টি ঘটনায় আওয়ামী লীগের সদস্যরা জড়িত ছিলেন এবং জামায়াত ৪৬টি ঘটনায় জড়িত ছিল।
টিআইবি’র প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকার পতনের পর অনেক অঞ্চলে আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রম দখল করার প্রচেষ্টা সংঘর্ষের মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবহন টার্মিনাল, স্ট্যান্ড, সিলেটের পাথর কোয়ারি ও নদী থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলন, ব্রিজ, বাজার, ঘাট, বালু মহাল ও জলাশয়ের ইজারা দখল।
গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনেকাংশে কার্যকর ছিল না। সহিংসতা ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত কর্মীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ায় দলগুলো ব্যর্থ হয়েছে।
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান জানান, সরকারের পক্ষ থেকে মব সহিংসতা যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, “মব সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে নির্বাচন সহ সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়তে বাধ্য। সরকার শুরু থেকে মব সহিংসতা প্রতিরোধে তৎপরতা দেখাতে পারেনি।”
তিনি আরও জানান, মব সহিংসতার উৎপত্তি সরকারি প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে। সচিবালয়ে প্রথমবারের মতো এই ধরনের কার্যক্রমের সূত্রপাত হয়েছিল। এরপর বাইরের শক্তিরা ক্ষমতায়িত হয়ে মব সৃষ্টি করেছে। এর ফলে সরকারের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়েছে।
যদিও ইফতেখারুজ্জামান আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে নির্বাচনকেন্দ্রিক আর কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটবে না, তিনি সতর্ক করেছেন যে সহিংসতার ঝুঁকি শুধুমাত্র ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সময় সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর পরবর্তী কয়েকদিনও সমস্যা দেখা দিতে পারে। তিনি জানান, সরকার এই ঝুঁকির বিষয়ে অবগত এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক অতীত নির্বাচনের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, অতীতের নির্বাচন থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, রাজনৈতিক সহিংসতা রোধ না করলে তা দেশের নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত করবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ সৃষ্টি করবে।
টিআইবি’র প্রতিবেদনের সারমর্ম হলো, মব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা শুধু রাজনৈতিক দলের নয়, সরকারের দায়ও। নির্বাচনের নিরপেক্ষতা, নিরাপত্তা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে মব সহিংসতা প্রতিরোধ করা অতীব জরুরি।