জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি ছিল নাজুক অবস্থায়—এমন মূল্যায়নই ছিল আলোচনায়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা ও বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যে দায়িত্ব নেয় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। তবে দেড় বছর পর ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের অনেকে বলছেন, অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি ঠিকই, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত গতি ফেরেনি।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-এর সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমানের মতে, পূর্ববর্তী সরকারের পতনের পর যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা সামাল দেওয়াই ছিল তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও প্রবৃদ্ধির গতি বাড়াতে পারেনি।
দায়িত্ব গ্রহণের সময় মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ, নতুন টাকা ছাপানো বন্ধ এবং ঋণের সুদহার বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে—যা অর্থনীতিবিদদের মতে এখনও উচ্চ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সময় কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করেও মূল্যস্ফীতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। একই ধরনের মত দেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর গবেষণা পরিচালক মাহফুজ কবির; তার মতে, অন্যান্য অনেক দেশ তুলনামূলক কম সময়ে মূল্যস্ফীতি সামাল দিলেও বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারে স্পষ্ট। আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেলসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দফায় দফায় বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি রোধে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
দারিদ্র্যের হার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংক-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা বর্তমানে ২১ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) বলছে, হারটি আরও বেশি—২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ।
উচ্চ সুদহার ও কঠোর ঋণনীতির ফলে বিনিয়োগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে বলে ব্যবসায়ী মহলের অভিযোগ। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিদেশি বিনিয়োগেও প্রভাব ফেলেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি; বরং বেকারত্ব বেড়েছে।
ব্যাংক খাতেও সংকট রয়ে গেছে। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি না হওয়ায় ঋণ বিতরণে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন মহলের দাবি, ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা মোট ঋণের ৩৩ শতাংশেরও বেশি। এতে বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তবে ইতিবাচক দিক হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি উল্লেখ করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় রিজার্ভ ১৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে।
সার্বিক মূল্যায়নে অর্থনীতিবিদদের অভিমত, অন্তর্বর্তী সরকার তাৎক্ষণিক ধস এড়াতে সক্ষম হলেও টেকসই পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে নতুন সরকারের সামনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার, ব্যাংক সংস্কার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন।