1. desherchitrabd@gmail.com : Desher DesherChitra : Desher Chitra
শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬, ০৮:০৯ অপরাহ্ন

গান-বাজনা : ঘরে অশান্তি, দারিদ্র্য ও অদৃশ্য বিপর্যয়

  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ অক্টোবর, ২০২৫

ধর্ম

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের প্রতিটি কাজের জন্য দিকনির্দেশনা প্রদান করে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য। ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর স্মরণ, আনুগত্য, ও আত্মার পরিশুদ্ধি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বর্তমান যুগে এমন অনেক কাজ আমাদের জীবনে প্রবেশ করেছে যা এই উদ্দেশ্যকে নষ্ট করছে।

তন্মধ্যে অন্যতম হলো গান-বাজনা। গান-বাজনা আপাতদৃষ্টিতে বিনোদনের মাধ্যম হলেও, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে আত্মিক শূন্যতা, আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখতা এবং শয়তানের দাসত্ব। কুরআন ও সহিহ হাদীসে গান-বাজনা ও তার প্রভাব সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে।

বিশেষত, যে ঘরে গান-বাজনা শোনা হয়, সে ঘর থেকে আল্লাহর রহমতের ফেরেশতারা দূরে সরে যান। এর ফলস্বরূপ সেখানে দেখা দেয় অশান্তি, মানসিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য ও জিন-শয়তানের প্রভাব।

 কুরআনের আলোকে গান-বাজনা

আল্লাহ তাআলা বলেন—

আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আছে, যারা অবান্তর কথা (لَهْوَ الْحَدِيثِ) ক্রয় করে, যাতে সে অজ্ঞতাবশত মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে এবং তা নিয়ে ঠাট্টা করে। তাদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।”
 (সূরা লুকমান, আয়াত: ৬)

এখানে “لَهْوَ الْحَدِيثِ” শব্দটির অর্থ কী— তা নিয়ে প্রাচীন মুফাসসিরগণ (তাফসিরবিদ) বিশদ আলোচনা করেছেন।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন— “এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে গান ও বাদ্যযন্ত্র।”
 ইবনু মাসউদ (রাঃ) শপথ করে বলেছেন, “আল্লাহর কসম! এর অর্থ গান ও গানের যন্ত্র ছাড়া কিছু নয়।”
(তাফসির তাবারী, ইবনু কাসির)

অতএব, কুরআন স্পষ্টত এমন কথাবার্তা ও আচরণ নিন্দা করেছে যা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় — আর গান-বাজনা সেইসব কিছুর মধ্যে পড়ে যা হৃদয়কে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে।

আল্লাহ আরও বলেন:

“যে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য শয়তানকে সঙ্গী বানিয়ে দিই, আর সে হয় তার নিকট সঙ্গী।”
(সূরা যুখরুফ: ৩৬)

গান-বাজনা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ করে, ফলে সে শয়তানের নিকটতম সঙ্গী হয়ে পড়ে। শয়তানের প্রভাব ঘরে প্রবেশ করে, ফেরেশতারা দূরে সরে যান।

 হাদীসের আলোকে গান-বাজনা

 ১. বাদ্যযন্ত্র হালাল মনে করা পাপ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক আসবে, যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ্যপান ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।”
(সহিহ বুখারি, হাদীস: ৫৫৯০)

এই হাদীস থেকে স্পষ্ট হয়, বাদ্যযন্ত্র হালাল নয়, বরং এটি হারাম। আর যারা একে হালাল মনে করবে, তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হুঁশিয়ারিকৃত গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

 ২. ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

যে ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে, সে ঘরে ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না।”
(সহিহ বুখারি, হাদীস: ৩২২৫)

উলামারা বলেন, যে ঘরে আল্লাহর অবাধ্যতা, গান-বাজনা, নাচ, অশ্লীলতা থাকে, সে ঘরেও ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না। কারণ ফেরেশতারা আল্লাহর রহমত বয়ে আনেন, আর গুনাহপূর্ণ স্থানে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয় না।

 ৩. অন্তর কঠিন হয়ে যায়

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

গান হচ্ছে শয়তানের কুরআন।”(ইবনু কাইয়্যিম, ইগাসাতুল লাহফান)

অর্থাৎ, কুরআন মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, আর গান মানুষকে শয়তানের পথে আহ্বান করে। যে অন্তর গান-বাজনায় নিমজ্জিত, সেখানে কুরআনের প্রভাব কমে যায়।

গান-বাজনার প্রভাব ও পরিণতি :

আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়া

যে ঘরে গান বাজে, সে ঘর থেকে রহমতের ফেরেশতারা দূরে সরে যায়। রহমত না থাকলে সেখানে শান্তি থাকতে পারে না।

নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” (সূরা রা’দ: ১১)
গান-বাজনার মাধ্যমে আমরা নিজেরাই আমাদের ঘর থেকে আল্লাহর রহমত তাড়িয়ে দিই।

অশান্তি বিবাদবিরোধ

যেখানে আল্লাহর স্মরণ থাকে না, সেখানে হৃদয়ে অহংকার, রাগ, হিংসা ও অস্থিরতা জন্মায়। ফলস্বরূপ দাম্পত্য জীবনে কলহ, সন্তানের অবাধ্যতা, এবং মানসিক চাপ দেখা দেয়।

দারিদ্র্য অভাব

আল্লাহ বলেন,

যে আল্লাহকে ভয় করে, আমি তার জন্য উত্তম রিযিকের ব্যবস্থা করি।” (সূরা তালাক: ২-৩)
গান-বাজনা আল্লাহভীরুতা কমিয়ে দেয়। ফলে রিযিকে বরকত থাকে না। হয়তো আয় থাকে, কিন্তু বরকত থাকে না— খরচ শেষ হয় অপ্রয়োজনে।

জিন শয়তানের প্রভাব

যে ঘরে কুরআন তিলাওয়াত হয়, আল্লাহর যিকির হয়, সে ঘরে জিন-শয়তান প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু যেখানে গান, নাচ, সিনেমা ও অশ্লীলতা থাকে, সেখানে শয়তানেরা আশ্রয় নেয়।

নিশ্চয়ই, শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরা ইয়াসিন: ৬০)

আত্মিক শূন্যতা পাপাচার

গান-বাজনা মানুষকে পাপের প্রতি আকৃষ্ট করে, হৃদয়কে আল্লাহর স্মরণ থেকে শূন্য করে ফেলে। ধীরে ধীরে মানুষ নামাযে অলস হয়, যিকির ছেড়ে দেয়, পরকালের ভয় হারায়।

সাহাবীদের দৃষ্টিতে গান-বাজনা

 ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: “গান হচ্ছে হারাম, আর গান শোনা হলো অন্যায়ের কাজ।”
 ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন: “গান মানুষের অন্তর থেকে কুরআনের স্বাদ কেড়ে নেয়।”
 ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রহঃ) বলেন: “গান হচ্ছে আত্মাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়ার এক উপায়, এবং এটা মদ্যপানের নেশার মতো অন্তরকে দুর্বল করে।”

 ঘরকে রহমতের কেন্দ্র বানানোর উপায় :

কুরআন তিলাওয়াত ও যিকির:
প্রতিদিন ঘরে কুরআন তিলাওয়াত করুন, বিশেষত সূরা বাকারা। হাদীসে আছে,

সূরা বাকারা পাঠ করা ঘরকে শয়তানমুক্ত রাখে।” (সহিহ মুসলিম)

নামায প্রতিষ্ঠা:
যেখানে নামায হয়, সেখানে রহমত নেমে আসে। নামায আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে।

অশ্লীলতা ও গান-বাজনা ত্যাগ:
টেলিভিশন, মোবাইল, ইউটিউবে অশ্লীল গান-বাজনা থেকে দূরে থাকুন। পরিবারকে উৎসাহ দিন ইসলামি অনুপ্রেরণামূলক গান (নশিদ) ও কুরআন শুনতে।

আল্লাহর যিকির:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

যে ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে, আর যে স্মরণ করে না — তারা জীবিত ও মৃতের মতো।” (সহিহ বুখারি)

পরিবারে দীন শিক্ষা:
পরিবারে দীন শেখা ও শেখানোর পরিবেশ তৈরি করুন। ইসলামিক বই, আলোচনা, দাওয়াতের মাধ্যমে ঘরকে নূরানী করুন।

গান-বাজনা এক প্রকার আত্মিক বিষ। এটি মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত করে, ঘরে জিন-শয়তানের প্রভাব বাড়ায়, সংসারে অশান্তি ও দারিদ্র্যের কারণ হয়।

আল্লাহ বলেন:

যারা পরহেযগারি অবলম্বন করে, আল্লাহ তাদের জন্য উত্তম রিযিক ও শান্তির পথ খুলে দেন।” (সূরা তালাক: ২-৩)

তাই আসুন, আমরা আমাদের ঘর থেকে গান-বাজনা, টিভির অশ্লীলতা, নাচ-গান, অপ্রয়োজনীয় বিনোদন দূর করি; পরিবর্তে কুরআন তিলাওয়াত, নামায, যিকির ও ইসলামিক আলোচনা চালু করি।

যে ঘরে আল্লাহর স্মরণ হয়, সে ঘর ফেরেশতাদের আগমনস্থল, রহমতের কেন্দ্র, বরকতের আধার। আর যে ঘরে গান বাজে, তা হয় শয়তানের আবাস।

 আল্লাহ আমাদের সকলকে এমন ঘর ও জীবন দান করুন, যেখানে তাঁর রহমত নেমে আসে, আর শয়তান দূরে থাকে। আমীন।

Share this Post in Your Social Media

এই ধরনের আরও খবর
Copyright © 2026, সাপ্তাহিক দেশের চিত্র. All rights reserved.
Theme Customized By BreakingNews