ধর্ম ডেস্ক
বাংলাদেশের ভূখণ্ড প্রাচীনকাল থেকেই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কেন্দ্রস্থল। হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্য প্রাচীন ধর্মের প্রভাব দীর্ঘদিন এ অঞ্চলে বিদ্যমান ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ইসলামের আগমন বাংলাদেশ তথা প্রাচ্যবঙ্গে একটি নতুন ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধ্যায়ের সূচনা করে। ইতিহাসবিদদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামের বিস্তার মূলত বাণিজ্য, সুফি সাধকদের প্রচার এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক শাসনের মাধ্যমে সংঘটিত হয়।
বাংলাদেশে ইসলামের প্রথম আগমন ঘটে শান্তিপূর্ণভাবে, প্রধানত আরব মুসলিম ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে। ৭ম ও ৮ম শতকে আরব, ফার্সি ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলিম ব্যবসায়ীরা বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী এলাকায় আগমন করেন। চট্টগ্রাম, বরিশাল, ভোলা, মঙ্গলকোট ও কক্সবাজার ছিল তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
এসব ব্যবসায়ী মসলিন, কাঠ, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়ের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তাদের সততা, নৈতিকতা ও জীবনাচরণে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক স্থানীয় মানুষ ইসলামের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
৮ম থেকে ১৩শ শতক পর্যন্ত সময়ে ইসলামের প্রচার প্রধানত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। মুসলিম ব্যবসায়ীরা শুধু ধর্মীয় বাণী প্রচারই করেননি, বরং ইসলামের নৈতিক শিক্ষা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক ন্যায়পরায়ণতার ধারণা মানুষের কাছে তুলে ধরেন। এই সময়ে কিছু স্থানীয় শাসক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন, যা ধর্মটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক হয়।
বাংলাদেশে ইসলামের প্রসারে সুফি সাধকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১২শ থেকে ১৫শ শতক পর্যন্ত বহু সুফি পীর ও দরবেশ এই অঞ্চলে আগমন করেন। শাহ সুলতান, শাহ পরাণ, খানজাহান আলি, শাহ আমানতসহ অনেক সুফি সাধক মানুষের মধ্যে ইসলামের মানবিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা ছড়িয়ে দেন। তারা দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সেবা, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরেন। তাদের সহজ ও সহনশীল দাওয়াত স্থানীয় জনগণের মধ্যে ইসলাম গ্রহণকে সহজ করে তোলে।
১৩শ শতকের শেষ ভাগে মুসলিম শাসনের বিস্তারের মাধ্যমে ইসলাম রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। দিল্লি সুলতান ও পরবর্তীতে মুঘল শাসনামলে বাংলায় মসজিদ, মাদ্রাসা ও ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক প্রসার ঘটে। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে ইসলামের প্রভাব সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত হয়।
ইসলাম আগমনের ফলে বাংলার সাহিত্য, সংগীত, স্থাপত্য ও লোকসংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। মসজিদ ও দরগাহ স্থাপত্য, ইসলামি উৎসব, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সামাজিক রীতিনীতিতে ইসলামের ছাপ স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
বাংলাদেশে ইসলামের আগমন একটি দীর্ঘ, শান্তিপূর্ণ ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়ার ফল। এটি শুধু একটি ধর্মীয় পরিবর্তন নয়, বরং বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা আজও জাতির জীবন ও পরিচয়ে গভীরভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে