ধর্ম ডেস্ক
সমাজে প্রায়ই একটি প্রশ্ন উঠে মায়ের সম্পত্তিতে কি মেয়ে ছেলের সমান ভাগ পায়? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি “হ্যাঁ” বা “না” দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। বিষয়টি নির্ভর করে ইসলামি উত্তরাধিকার আইন, ওসিয়ত (ইচ্ছাপত্র) এবং জীবদ্দশায় সম্পত্তি বণ্টনের নিয়মের ওপর।
ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তার সম্পত্তি নির্দিষ্ট নিয়মে বণ্টন করা হয়। একজন মা যদি মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে তার সন্তানরা ছেলে ও মেয়ে উত্তরাধিকারী হিসেবে সম্পত্তি পাবে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম রয়েছে: ছেলে সাধারণত মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পায়। অর্থাৎ, যদি একজন মা এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে যান, তাহলে সম্পত্তি তিন ভাগে ভাগ হবে ছেলে পাবে দুই ভাগ এবং মেয়ে পাবে এক ভাগ।
এই নিয়মের পেছনে ইসলামি সমাজব্যবস্থার একটি যুক্তি রয়েছে। সাধারণত পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব ছেলের ওপর বর্তায়, যেখানে মেয়ের ব্যক্তিগত সম্পদ তার নিজেরই থাকে। তবুও বাস্তব জীবনে অনেকেই মনে করেন, বর্তমান সমাজে মেয়েদের সমান অধিকার থাকা উচিত, কারণ তারাও পরিবার ও অর্থনীতিতে সমান অবদান রাখছে।
এখন প্রশ্ন আসে মা কি ওসিয়তের মাধ্যমে মেয়েকে ছেলের সমান বা বেশি অংশ দিতে পারেন? ইসলামি আইনে ওসিয়ত করার সুযোগ রয়েছে, কিন্তু তা সীমাবদ্ধ। একজন ব্যক্তি তার মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) পর্যন্ত ওসিয়ত করতে পারেন। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—যারা আগে থেকেই উত্তরাধিকারী, যেমন ছেলে বা মেয়ে, তাদের জন্য ওসিয়ত করা সাধারণত বৈধ নয়, যদি না অন্য উত্তরাধিকারীরা এতে সম্মতি দেয়।
অর্থাৎ, মা যদি ওসিয়ত করে মেয়েকে বেশি সম্পত্তি দিতে চান, তাহলে তা কার্যকর হবে তখনই, যখন অন্য উত্তরাধিকারীরা এতে রাজি থাকবে। অন্যথায়, শরিয়াহ অনুযায়ী নির্ধারিত অংশই কার্যকর হবে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রয়েছে জীবদ্দশায় সম্পত্তি বণ্টন বা “হেবা” (উপহার)। মা যদি জীবিত অবস্থায় তার সম্পত্তি মেয়েকে উপহার হিসেবে দিয়ে দেন, তাহলে তিনি চাইলে মেয়েকে ছেলের সমান বা এমনকি বেশি অংশও দিতে পারেন। এটি ইসলামি আইনে বৈধ। তবে এই ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও পারিবারিক শান্তি বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিরোধ না সৃষ্টি হয়।
বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরা তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়। সামাজিক চাপ, অজ্ঞতা এবং পারিবারিক প্রভাবের কারণে তারা অনেক সময় নিজেদের অংশ দাবি করতে পারে না। অথচ আইন ও ধর্ম উভয়ই তাদের নির্দিষ্ট অধিকার নিশ্চিত করেছে।
সর্বোপরি বলা যায়, মায়ের সম্পত্তিতে মেয়ের অধিকার নিশ্চিত তবে তা নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে। সরাসরি ওসিয়তের মাধ্যমে সমান অংশ দেওয়া সবসময় সম্ভব না হলেও, জীবদ্দশায় উপহার দেওয়ার মাধ্যমে তা করা যায়। তাই প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান, সচেতনতা এবং ন্যায়ভিত্তিক মানসিকতা, যাতে নারী তার প্রাপ্য অধিকার যথাযথভাবে পেতে পারে।
একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য নারীর সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।