1. desherchitrabd@gmail.com : Desher DesherChitra : Desher Chitra
শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:৩৯ অপরাহ্ন

কোরআন শোনার স্নায়বিক প্রভাব: মস্তিষ্কে শান্তি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের নতুন পথ

  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক

ধর্মীয় চর্চা এবং মানব মনস্তত্ত্বের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই মনোবিজ্ঞান এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণার বিষয় হয়ে আসছে। বিশেষ করে ইসলামী ধারায় কোরআনের তেলাওয়াত বা পাঠকে শুধু আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের জন্য নয়, বরং মানসিক শান্তি এবং স্নায়বিক সুস্থতার দিক থেকেও মূল্যায়ন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক স্নায়ুবিজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে কোরআন শোনা মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশকে সক্রিয় করে, যা মানসিক চাপ কমাতে, আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে এবং গভীর শিথিলতা প্রদান করতে সক্ষম।

কোরআনের তেলাওয়াত শোনার সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলে স্নায়বিক ক্রিয়াকলাপ বৃদ্ধি পায়। গবেষকরা দেখেছেন যে অ্যান্টারিয়র সিংগুলেট কর্টেক্স (anterior cingulate cortex) এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (prefrontal cortex) বিশেষভাবে সক্রিয় হয়। এই অঞ্চলের কাজ মূলত আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা। তাই কোরআন শোনার মাধ্যমে মনোযোগী শোনার অভ্যাস বৃদ্ধি পায়, যা মস্তিষ্ককে ইতিবাচক আবেগের দিকে প্রণোদিত করে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুবিজ্ঞানিক প্রভাব হলো দুশ্চিন্তা এবং উদ্বেগ হ্রাস। কোরআনের ধীর এবং সুরম্য তেলাওয়াত মনোযোগের সাথে যুক্ত প্যারাসিম্প্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে। প্যারাসিম্প্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র হ্রাসকৃত হৃদস্পন্দন, নিঃশ্বাসের গভীরতা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেহে স্বস্তি এবং শান্তি উৎপন্ন করে। বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন যে, নিয়মিত কোরআন শোনা ব্যক্তিরা কম উদ্বেগপূর্ণ অনুভূতি এবং মানসিক চাপ অনুভব করেন।

অন্যদিকে, কোরআন শোনার সময় অ্যানিম্যাল কর্টেক্স ও অ্যামিগডালা অঞ্চলের কার্যক্রমও প্রভাবিত হয়। অ্যামিগডালা মূলত আবেগ বিশেষ করে ভয় ও হতাশার সঙ্গে সম্পর্কিত। কোরআন শোনার ধীর ছন্দ এবং সুরের প্রভাব অ্যামিগডালার অতিসক্রিয়তা কমিয়ে দেয়, ফলে মানসিক চাপ এবং নেতিবাচক আবেগের প্রবণতা হ্রাস পায়। এ কারণে কোরআন তেলাওয়াতকে একটি প্রাকৃতিক আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে যে কোরআন শোনার সাথে মস্তিষ্কে ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়ে। ডোপামিন আমাদের সুখ এবং উদ্দীপনা অনুভূতিতে ভূমিকা রাখে, আর সেরোটোনিন মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে কোরআন শোনার অভ্যাস মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে এবং দুশ্চিন্তা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো স্মৃতি এবং মনোযোগ উন্নয়ন। কোরআনের ছন্দবদ্ধ এবং পুনরাবৃত্তিমূলক পাঠ মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলের কার্যক্রম বাড়ায়। হিপোক্যাম্পাস মূলত স্মৃতি সংরক্ষণ এবং শেখার প্রক্রিয়ার জন্য দায়ী। নিয়মিত কোরআন শোনার অভ্যাস শিক্ষার্থী এবং প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের মধ্যে মনোযোগ, স্মৃতি শক্তি এবং মানসিক ফোকাস বাড়াতে সাহায্য করে।

অধিকন্তু, কোরআনের শব্দ এবং সুরের ধারাবাহিকতা মস্তিষ্কে আলফা তরঙ্গ বৃদ্ধি করে। আলফা তরঙ্গের বৃদ্ধি সাধারণত শিথিল এবং স্ট্রেস-মুক্ত অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি প্রমাণ করে যে কোরআন শোনার সময় মস্তিষ্কের কার্যক্রম একটি ধীর ও স্থিতিশীল ছন্দে চলে, যা মানসিক শান্তি এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বাড়ায়।

কেবল স্নায়ুবিজ্ঞানের প্রভাব নয়, কোরআন শোনার সামাজিক এবং মানসিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার বা সমাজের সঙ্গে একত্রে কোরআন শোনার অভ্যাস সম্পর্ক উন্নয়ন, সহমর্মিতা এবং সামাজিক সমন্বয় বাড়াতে সাহায্য করে। এই সামাজিক সংযোগও মস্তিষ্কের অক্সিটোসিন হরমোনকে প্রভাবিত করে, যা সুখ এবং আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সর্বশেষে বলা যায়, কোরআন শোনা একটি প্রাচীন আধ্যাত্মিক অনুশীলন হলেও, আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের আলোকে এটি এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। এটি শুধু আত্মিক শান্তির মাধ্যম নয়, বরং মস্তিষ্কের স্নায়বিক কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার একটি প্রমাণিত পথ। নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত মানসিক চাপ হ্রাস, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, স্মৃতি এবং মনোযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি গভীর শান্তি এবং স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম।

এভাবে দেখা যায় যে কোরআন শোনা এক ধরনের প্রাকৃতিক স্নায়ুবিজ্ঞান ভিত্তিক মেডিটেশন, যা মস্তিষ্ককে পুনঃসংগঠিত করে, নেতিবাচক আবেগ কমায় এবং মানসিক শান্তির নতুন পথ তৈরি করে। আধুনিক জীবনযাত্রার মানসিক চাপ এবং উদ্বেগের মাঝে কোরআনের সুর এবং ছন্দ একটি নির্ভরযোগ্য এবং বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত মানসিক শান্তির উপায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

Share this Post in Your Social Media

এই ধরনের আরও খবর
Copyright © 2026, সাপ্তাহিক দেশের চিত্র. All rights reserved.
Theme Customized By BreakingNews