দেশের চিত্র প্রতিবেদন
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ প্রশ্নটি গত দুই দশকে জাতীয় নিরাপত্তা, রাজনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিশেষ করে নিও-জেএমবি (Neo-JMB) নামটি ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার পর দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, এই গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক জিহাদি মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত এবং বাংলাদেশের ভেতরে উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন সরকারের সময়ে এই সংগঠনকে ঘিরে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত আলোচনা দেখা গেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে জঙ্গিবাদ দমনে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা হয়। বিশেষ করে ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার পর দেশজুড়ে ব্যাপক সাঁড়াশি অভিযান পরিচালিত হয়। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট, র্যাব এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা নিও-জেএমবি ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চালায়। সরকারের দাবি ছিল, এসব অভিযানের ফলে সংগঠনটির সাংগঠনিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে সমালোচকরা অভিযোগ করেন যে, জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইন প্রয়োগ করা হয়েছে। সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে এবং জঙ্গিবাদ প্রসঙ্গেও নতুন বিতর্ক শুরু হয়। কিছু কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক দাবি করেন যে, পূর্ববর্তী সময়ে জঙ্গিবাদের হুমকি রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করা হয়েছিল। অন্যদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশ সতর্ক করে বলেন যে, জঙ্গিবাদী মতাদর্শের উপস্থিতি এখনও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি এবং অনলাইনভিত্তিক উগ্রবাদ নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেশ কয়েকটি জঙ্গিবাদ-সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একাধিক ব্যক্তিকে নিও-জেএমবি বা ইসলামিক স্টেট (আইএস)-অনুপ্রাণিত নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আটক করে। এর মধ্যে হবিগঞ্জে এক শিশুকে আটক করার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পুলিশের দাবি ছিল, সে অনলাইনের মাধ্যমে উগ্রবাদী প্রচারণা, সদস্য সংগ্রহ এবং হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি আদালতের মাধ্যমে হওয়া প্রয়োজন।
২০২৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় রাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সরকার প্রকাশ্যে জানায় যে, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ‘শূন্য সহনশীলতা’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সন্দেহভাজন নেটওয়ার্কের ওপর নজরদারি অব্যাহত রাখে এবং অনলাইন উগ্রবাদ প্রতিরোধে নতুন উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানায়। একই সঙ্গে সরকার রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করে।
নিও-জেএমবির বর্তমান কার্যক্রম আগের তুলনায় সীমিত বলে ধারণা করা হলেও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংগঠনটির মূল ঝুঁকি এখন অনলাইন প্রচারণা, গোপন নেটওয়ার্ক এবং এককভাবে উগ্রপন্থায় উদ্বুদ্ধ ব্যক্তিদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে কেবল আইনশৃঙ্খলা অভিযান নয়, শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায় যে, জঙ্গিবাদ একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। শেখ হাসিনা সরকারের কঠোর নিরাপত্তা অভিযান, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময়কার পুনর্মূল্যায়ন এবং ২০২৬ সালের বিএনপি সরকারের নিরাপত্তা নীতির মধ্য দিয়ে বিষয়টি নতুন নতুন মাত্রা পেয়েছে। তবে সরকার যেই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, উগ্রবাদ মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক প্রতিরোধই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।