দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নের ঘটনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষক কিংবা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী নির্যাতন ও যৌন হয়রানির অভিযোগ উদ্বেগজনকভাবে সামনে আসছে। বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে শিশু ও কিশোর শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা সমাজে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠছে কেন বারবার মাদ্রাসাগুলোতে এমন ঘটনা ঘটছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে একাধিক সামাজিক, প্রশাসনিক ও মানসিক কারণ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব। দেশের অনেক মাদ্রাসা আবাসিক হওয়ায় শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকে। ফলে তাদের নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভর করে শিক্ষক ও পরিচালকদের ওপর। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় কিছু অসাধু ব্যক্তি সুযোগ পেয়ে যায়।
শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, অনেক সময় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা ভয়, লজ্জা কিংবা সামাজিক চাপে মুখ খুলতে পারে না। বিশেষ করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলে সমাজের একাংশ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে নির্যাতনের শিকার অনেক শিশু দীর্ঘদিন চুপ থেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ক্ষমতার অপব্যবহারও এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির একটি কারণ। শিক্ষককে অনেক শিক্ষার্থী অভিভাবকের মতো শ্রদ্ধা করে। সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যক্তি অপরাধ করে থাকে। এছাড়া কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই না হওয়াও উদ্বেগের বিষয়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, যৌন বিকৃতি, নৈতিক অবক্ষয় এবং মানসিক অসুস্থতার কারণেও কেউ কেউ শিশুদের টার্গেট করে। শিশুদের সহজ-সরলতা এবং ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখার প্রবণতাকে কাজে লাগায় অপরাধীরা। আবাসিক পরিবেশে যেখানে বাইরের মানুষের প্রবেশ সীমিত, সেখানে এসব ঘটনা দীর্ঘদিন আড়ালেও থেকে যায়।
অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠলেও দ্রুত বিচার বা কঠোর শাস্তি না হওয়ায় অপরাধীরা সাহস পায় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কিছু ঘটনায় স্থানীয় প্রভাবশালী মহল কিংবা প্রতিষ্ঠানের সুনামের অজুহাতে বিষয়গুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। এতে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।
তবে শিক্ষাবিদরা বলছেন, কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার দায় পুরো মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপানো ঠিক নয়। দেশের অসংখ্য মাদ্রাসা সুনামের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অনেক শিক্ষক নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলছেন। তাই অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে, কিন্তু কোনোভাবেই ধর্মীয় শিক্ষা বা পুরো ব্যবস্থাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে নিয়মিত মনিটরিং বাড়াতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করতে হবে। শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলকভাবে বাস্তবায়ন এবং অভিযোগ গ্রহণের নিরাপদ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদেরও সচেতন করতে হবে। কোন আচরণ অনৈতিক বা নির্যাতনের মধ্যে পড়ে, তা শিশুদের বুঝিয়ে বলতে হবে। পরিবারকেও সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে, যাতে তারা ভয় ছাড়াই নিজেদের সমস্যার কথা জানাতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সমাজ ও ধর্মীয় নেতাদেরও এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষার মূল ভিত্তি নৈতিকতা ও মানবিকতা। তাই ধর্মের আড়ালে কোনো অপরাধী যেন পার পেয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নের ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য সতর্কবার্তা। শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।