দেশের চিত্র প্রতিবেদন
মানব পাচার বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী অপরাধ। আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এই অপরাধের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় শ্রম শোষণ, যৌন নির্যাতন বা অঙ্গ পাচারের জন্য মানুষ পাচার করা হলেও বর্তমানে সাইবার প্রতারণার কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যেও মানব পাচার বেড়ে চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশি তরুণদের উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কম্বোডিয়ায় নিয়ে গিয়ে চীনা সাইবার প্রতারক চক্রের কাছে বিক্রি করার ঘটনা নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
বিভিন্ন সূত্র ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ তরুণদের টার্গেট করছে একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র। তাদের মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকা বেতনের চাকরি, উন্নত জীবনযাপন এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের লোভ দেখানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা জমি বিক্রি করে বা ঋণ নিয়ে দালালদের মোটা অঙ্কের টাকা পরিশোধ করেন। এরপর বৈধ কাগজপত্র ও ভিসার মাধ্যমে তাদের কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়।
কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তরুণদের বিভিন্ন স্ক্যামিং কম্পাউন্ডে নিয়ে গিয়ে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার মার্কিন ডলারের বিনিময়ে চীনা পরিচালিত অপরাধচক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। কম্বোডিয়ার বিভিন্ন শহরে গড়ে ওঠা এসব বহুতল ভবন ও কম্পাউন্ডে হাজার হাজার মানুষকে আটকে রেখে অনলাইন প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হয়।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ইউরোপ ও আমেরিকার ধনী ব্যক্তিদের সঙ্গে ভুয়া পরিচয়ে সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধ্য করা হয়। আকর্ষণীয় নারী পরিচয়ে পরিচালিত ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রথমে বিশ্বাস অর্জন করা হয়। পরে বিভিন্ন ভুয়া বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মে অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়। শুরুতে কিছু লাভ দেখিয়ে আস্থা তৈরি করা হলেও একপর্যায়ে বিনিয়োগকারীদের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
যেসব তরুণ এই কাজে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায় অথবা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তাদের ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। অনেককে মারধর, ইলেকট্রিক শক, খাদ্যবঞ্চনা এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কেউ কেউ টর্চার সেলে দিনের পর দিন বন্দি থেকেছেন। নির্যাতনের মাত্রা এমন ছিল যে অনেক ভুক্তভোগী গুরুতর শারীরিক ও মানসিক আঘাত নিয়ে দেশে ফিরেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মানব পাচারের এক নতুন ও জটিল রূপ, যা আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভিয়েতনামসহ একাধিক দেশের অপরাধী নেটওয়ার্ক জড়িত। এই চক্রের মাধ্যমে শুধু মানব পাচারই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাইবার প্রতারণাও সংঘটিত হচ্ছে।
ইতোমধ্যে কম্বোডিয়ার বিভিন্ন স্ক্যামিং কম্পাউন্ড থেকে শত শত বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে এখনো বহু বাংলাদেশি সেখানে আটকে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মানব পাচার প্রতিরোধে সরকারের কঠোর নজরদারি, বিদেশে চাকরির প্রস্তাব যাচাই-বাছাই, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি বিদেশগামী কর্মীদের নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
চাকরির প্রলোভনে মানব পাচারের এই নতুন কৌশল দেশের তরুণ সমাজের জন্য এক বড় হুমকি। সচেতনতা, আইন প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব। মানব পাচারমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার জন্য সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।