1. desherchitrabd@gmail.com : Desher DesherChitra : Desher Chitra
সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন

শিশু ধর্ষণ: মনোবিজ্ঞান কী বলে?

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

দেশের চিত্র প্রতিবেদন

শিশু ধর্ষণ বা শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ সামাজিক ও মানসিক সমস্যা। এটি শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং একটি শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক জীবনের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা একটি গভীর মানসিক ট্রমা, যা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে এবং তার ভবিষ্যৎ জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। একটি শিশু যখন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন সে শুধু শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; বরং তার ভেতরের নিরাপত্তাবোধ, আত্মবিশ্বাস এবং মানুষের প্রতি বিশ্বাসও ভেঙে পড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, শিশুকে যৌন কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা বা যৌন আচরণে বাধ্য করাই শিশু যৌন নিপীড়ন। অনেক সময় শিশুরা বিষয়টির ভয়াবহতা বুঝতে না পেরে প্রলোভন, ভয় বা প্রতারণার শিকার হয়। মনোবিজ্ঞান বলছে, শিশুরা বয়সে ছোট এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায় অপরিপক্ব হওয়ায় তারা সহজেই নির্যাতনের শিকার হতে পারে। অপরাধীরা সাধারণত মনে করে, শিশুদের ভয় দেখিয়ে বা প্রলোভন দিয়ে চুপ করিয়ে রাখা সহজ।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে তার মানসিক জগতে। একটি শিশু যখন এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়, তখন তার মনে ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ এবং অসহায়ত্ব জন্ম নেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধী পরিচিত কেউ হয় যেমন আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক কিংবা পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। ফলে শিশুর মনে মানুষের প্রতি বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়। সে ভাবতে শুরু করে, পৃথিবী তার জন্য নিরাপদ নয়। এই অনুভূতি তাকে দীর্ঘদিন মানসিক অস্থিরতার মধ্যে রাখে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, যৌন নির্যাতনের ফলে শিশুদের মধ্যে “পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার” বা PTSD দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় শিশুরা বারবার সেই ভয়াবহ ঘটনার স্মৃতি মনে করতে থাকে। তারা দুঃস্বপ্ন দেখে, হঠাৎ ভয় পেয়ে যায় এবং অনেক সময় একা থাকতে ভয় পায়। কেউ কেউ অস্বাভাবিক চুপচাপ হয়ে যায়, আবার কেউ অতিরিক্ত রাগী ও আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করে। স্কুলে মনোযোগ কমে যায়, পড়াশোনায় খারাপ ফল হয় এবং সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক শিশু নিজের ভেতরে গুটিয়ে যায় এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না।

শিশুদের আচরণগত পরিবর্তন যৌন নির্যাতনের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, কোনো শিশু যদি হঠাৎ নির্দিষ্ট কাউকে ভয় পেতে শুরু করে, রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে, হঠাৎ চমকে ওঠে বা বিছানা ভেজানো শুরু করে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। কারণ এগুলো অনেক সময় মানসিক ট্রমার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে।

চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী ডাঃ ইশরাত শারমিন রহমানের মতে, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শরীর সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। তিনি বলেন, শিশুকে তার শরীরের বিশেষ কিছু অংশ সম্পর্কে জানাতে হবে এবং বোঝাতে হবে যে, বাবা-মা ছাড়া অন্য কেউ সেখানে স্পর্শ করতে পারবে না। কেউ এমন আচরণ করলে সঙ্গে সঙ্গে তা পরিবারকে জানাতে হবে। মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী, শিশুদের ভয় দেখিয়ে নয়; বরং গল্প, ছবি বা খেলার মাধ্যমে সচেতন করা বেশি কার্যকর।

মনোবিজ্ঞান আরও বলছে, যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুরা প্রায়ই নিজেদের দোষী মনে করে। অপরাধীরা অনেক সময় শিশুকে ভয় দেখিয়ে বলে, “এ কথা কাউকে বললে খারাপ হবে” অথবা “তোমারই দোষ।” ফলে শিশুর মনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সে ভাবতে শুরু করে, হয়তো ঘটনাটি তার কারণেই ঘটেছে। এই অপরাধবোধ দীর্ঘমেয়াদে বিষণ্নতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং আত্মঘৃণার জন্ম দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর কথা বিশ্বাস করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পরিবারে শিশুদের অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে শিশুরা মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়ে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশু যদি এমন কোনো অভিযোগ করে, তাহলে তাকে গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে এবং নিরাপদ অনুভব করাতে হবে। কারণ শিশু সাধারণত এ ধরনের বিষয় বানিয়ে বলে না।

শিশু ধর্ষণের প্রভাব শুধু শৈশবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব বড় হওয়ার পরও থেকে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ছোটবেলায় যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া অনেক ব্যক্তি পরবর্তীতে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, সম্পর্কের জটিলতা এবং মাদকাসক্তির মতো সমস্যায় ভোগেন। কেউ কেউ সমাজ ও মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। এমনকি আত্মহত্যার চিন্তাও দেখা দিতে পারে। তাই মনোবিজ্ঞানীরা এটিকে শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং একটি গভীর মানসিক স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করেন।

এই সমস্যা মোকাবিলায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিশুকে নিরাপদ পরিবেশ দিতে হবে, তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে এবং তাকে সাহসের সঙ্গে নিজের কথা বলতে শেখাতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে শিশু সুরক্ষা বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

শিশু ধর্ষণ একটি ভয়াবহ মানবিক ও মানসিক সংকট। মনোবিজ্ঞান আমাদের শেখায়, একটি শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের মানসিকভাবে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

Share this Post in Your Social Media

এই ধরনের আরও খবর
Copyright © 2025-2026, সাপ্তাহিক দেশের চিত্র. All rights reserved.
Theme Customized By BreakingNews