নিজস্ব প্রতিবেদক
এক সময়ের শান্ত, সবুজ ও পর্যটননির্ভর নগরী সিলেট ধীরে ধীরে অনিরাপদ শহরের তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে এমন অভিযোগ এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে। সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাই, চুরি, মাদক, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং সহিংস ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে কেন এমন হচ্ছে এবং এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী?
সিলেট দীর্ঘদিন ধরেই প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল একটি শহর। এখানকার অর্থনৈতিক প্রবাহ তুলনামূলক শক্তিশালী হওয়ায় নগরীতে নগদ অর্থ ও ভোগ্যপণ্যের উপস্থিতি বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থনৈতিক বৈষম্যই অপরাধ প্রবণতা বাড়ার একটি বড় কারণ। একদিকে উচ্চবিত্ত ও প্রবাসী পরিবারের বিলাসী জীবনযাপন, অন্যদিকে বেকার বা স্বল্পআয়ের মানুষের হতাশা এই বৈপরীত্য অনেক সময় অপরাধে প্ররোচিত করে।
অন্যদিকে, কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি এখন সিলেটের অন্যতম বড় উদ্বেগ। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের ছোট ছোট দল নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি দেখানো, প্রভাব বিস্তার এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভ এসব কারণেই তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।
মাদক সমস্যাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদক সহজলভ্য হওয়ায় তরুণদের একটি অংশ দ্রুত আসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদকের টাকার জোগান দিতে গিয়ে তারা ছিনতাই, চুরি কিংবা সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনার দুর্বলতাও একটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। অপর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট, নজরদারির অভাব এবং কিছু এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি কম থাকায় অপরাধীরা সহজেই সুযোগ পাচ্ছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় অনেক এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা প্রকট হয়ে ওঠে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সীমাবদ্ধতাও আলোচনায় রয়েছে। জনসংখ্যা ও নগর বিস্তারের তুলনায় পুলিশের সংখ্যা ও সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয়। যদিও পুলিশ বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করে, তবে তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া সামাজিক অবক্ষয় ও পারিবারিক নজরদারির অভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অনুপস্থিতি বা উদাসীনতার কারণে তরুণরা ভুল পথে যাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সহশিক্ষা কার্যক্রম কমে যাওয়া এবং ইতিবাচক সামাজিক সম্পৃক্ততার অভাবও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রথমত, কিশোরদের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ বাড়ানো জরুরি। এতে তারা ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত হবে। দ্বিতীয়ত, মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। তৃতীয়ত, নগরীতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত টহল জোরদার করা প্রয়োজন।
এছাড়া কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং তরুণদের জন্য অর্থনৈতিক বিকল্প তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে হতাশা কমবে এবং অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা হ্রাস পাবে।
সিলেট শহরের বর্তমান অনিরাপত্তা কোনো একক কারণে তৈরি হয়নি; বরং এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যার ফল। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে এই ঐতিহ্যবাহী শহর আবারও তার স্বাভাবিক নিরাপদ পরিবেশ ফিরে পেতে পারে এমনটাই প্রত্যাশা নগরবাসীর।