আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি গোপন সামরিক নথি থেকে জানা গেছে, ভিয়েতনাম সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আগ্রাসী কৌশল এবং যুদ্ধে হস্তক্ষেপের ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে। নথিতে যুক্তরাষ্ট্রকে “যুদ্ধবাজ শক্তি” হিসেবে আখ্যা দিয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই তথ্য মানবাধিকার সংস্থা দ্য ৮৮ প্রজেক্ট মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে।
নথিটি ২০২৪ সালের আগস্টে ভিয়েতনামের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রস্তুত করেছিল। শিরোনাম দেওয়া হয়েছিল “দ্বিতীয় মার্কিন আগ্রাসন পরিকল্পনা”। এতে দেশের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা রক্ষার জন্য সম্ভাব্য পদক্ষেপ ও কৌশলগত সতর্কতা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষত নথিতে প্রতিরক্ষা এবং কূটনৈতিক ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে যাতে ভেতরে শান্তি বজায় রাখা যায়, তবে বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে সতর্কতা থাকে।
এই নথি প্রকাশের সময় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রায় এক বছর আগে ভিয়েতনাম ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই অংশীদারিত্বে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব সমানভাবে বিবেচনা করা হয়। তবে নথিতে দেখা যাচ্ছে যে, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না। এটি সরকারের দ্বিমুখী পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন, যেখানে বাহ্যিক কূটনৈতিক সৌহার্দ্য বজায় রাখা হলেও অভ্যন্তরীণভাবে সংশয় রয়ে গেছে।
নথিতে সরাসরি সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা কম বলা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা চীনের প্রভাব মোকাবিলার অংশ হিসেবে অপ্রচলিত কৌশল ব্যবহার করতে পারে বা হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরি করতে পারে, এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া নথিতে “কালার রেভ্যুলুশন” সম্পর্কিত সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ আছে। ভিয়েতনামের নেতৃত্ব মনে করছে, বিদেশি শক্তি গণতান্ত্রিক আন্দোলন, মানবাধিকার বিষয়ক ইস্যু বা ধর্ম ও জাতিগত তফাৎ কাজে লাগিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন উসকে দিতে পারে।
নথিতে ইউক্রেনের ২০০৪ সালের অরেঞ্জ বিপ্লব এবং ফিলিপাইনের ১৯৮৬ সালের পিপল পাওয়ার আন্দোলন উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, ভিয়েতনাম অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক।
দ্য ৮৮ প্রজেক্টের সহপরিচালক বেন সুয়ান্টন বলেন, এই নথিতে প্রকাশিত উদ্বেগ ভিয়েতনাম সরকারের ভেতরের একটি বিস্তৃত ঐকমত্যের প্রতিফলন। তাঁর মতে, হ্যানয় যুক্তরাষ্ট্রকে প্রকৃত কৌশলগত মিত্র হিসেবে মনে করে না এবং চীনবিরোধী কোনো জোটে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা নেই।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নথি দেখাচ্ছে যে ভিয়েতনাম দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বন করছে: বিদেশের সাথে অংশীদারিত্ব বজায় রাখা, তবে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য সতর্ক থাকা।
এ বিষয়ে ভিয়েতনামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরও সরাসরি প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তবে তারা জানিয়েছে, দুই দেশের অংশীদারিত্বের লক্ষ্য হলো যৌথ সমৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
ফাঁস হওয়া এই নথি ভিয়েতনামের কৌশলগত চিন্তাভাবনা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে তাদের সতর্কতা তুলে ধরে। যদিও সরাসরি সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা কম বলা হয়েছে, ভেতরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং বিদেশি প্রভাব সীমিত করার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: ABC News, Human Rights Organization “The 88 Project”, ভিয়েতনাম প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়