দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা যেন থামছেই না। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ধর্ষণ, নির্যাতন, আত্মহত্যা কিংবা রহস্যজনক মৃত্যুর খবর প্রকাশ হচ্ছে। এসব ঘটনার শিকারদের অধিকাংশই নারী ও কিশোরী। সমাজের নানা স্তরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও অপরাধের লাগাম টানা যাচ্ছে না। সম্প্রতি “রামিসা” নামের এক কিশোরীর মর্মান্তিক ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে “এভাবে আর কত রামিসা শেষ হবে?”
রামিসা কেবল একজন ব্যক্তি নয়; তিনি এ দেশের অসংখ্য নির্যাতিত ও নিপীড়িত মেয়েদের প্রতীক। প্রতিনিয়ত সমাজের নানা প্রান্তে অসংখ্য রামিসা নিরবে সহ্য করছে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। কেউ প্রতিবাদ করতে গিয়ে হুমকির মুখে পড়ছে, আবার কেউ সামাজিক লজ্জা ও ভয় থেকে চুপ করে থাকছে। অনেক ক্ষেত্রে বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক সচেতনতার অভাব, মাদকের বিস্তার এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতা যেমন যোগাযোগ বাড়িয়েছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন ধরনের অপরাধের ক্ষেত্র। অনেক তরুণ ও কিশোর অনলাইন আসক্তি, অশ্লীল কনটেন্ট এবং অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর প্রভাবে বিপথে যাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় নিয়মিত মামলা ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করেই এ সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, বর্তমানে অনেক পরিবারে সন্তানদের প্রতি যথেষ্ট নজরদারি নেই। নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়ায় তরুণদের একাংশ সহিংস ও অসংবেদনশীল হয়ে উঠছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে অনেক অপরাধী সহজেই পার পেয়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে।
নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকারদের অনেকেই সামাজিক চাপের কারণে অভিযোগ করতে সাহস পান না। মামলা করলেও দীর্ঘসূত্রতা, ভয়ভীতি ও হয়রানির কারণে অনেক পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে অপরাধীরা আরও সাহস পায়।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিশু ও কিশোরদের ছোটবেলা থেকেই নৈতিকতা, মানবিকতা এবং নারীর প্রতি সম্মানবোধ শেখাতে হবে। কেবল পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষা নয়, পরিবার ও সমাজকেও ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক সম্পৃক্ততা তরুণদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিটি ঘটনার পর সাময়িক প্রতিবাদ হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা চাপা পড়ে যায়। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন কার্যকর বিচার, কঠোর শাস্তি এবং সামাজিক প্রতিরোধ। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায় আর কত রামিসাকে এভাবে হারাতে হবে? নিরাপদ সমাজ গঠনে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নইলে প্রতিদিন নতুন নতুন রামিসার গল্পই শুনতে হবে দেশবাসীকে।