অনলাইন ডেস্ক
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পুরোনো ভিডিওকে কেন্দ্র করে ‘ধর্ম অবমাননা’র অভিযোগ তুলে এক পীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে উত্তেজিত জনতা। একই সঙ্গে তাঁর দরবারে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
শনিবার (১১ এপ্রিল) বেলা আড়াইটার দিকে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের ফিলিপনগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তি শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর (প্রায় ৫৫), তিনি ওই গ্রামের মৃত জেছের আলীর ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগের একটি ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও শুক্রবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে শামীম রেজা পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন এমন অভিযোগ ওঠে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
শনিবার সকালে শামীমের দরবার থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে আবেদের ঘাট এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হন। পরে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা মিছিল নিয়ে দরবারের দিকে অগ্রসর হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মিছিলের একটি অংশ দরবারে ঢুকে পড়লে সেখানে থাকা দুটি পাকা ভবন ও একটি টিনশেড ঘরে ভাঙচুর চালানো হয়। একপর্যায়ে ভবনগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। হামলার সময় দরবারে থাকা অন্তত ৫ থেকে ৭ জন আহত হন। অন্যরা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যান।
পরে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও জনতার তুলনায় সদস্যসংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। উত্তেজিত জনতা শামীম রেজাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয়।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন বলেন, “পুলিশ শামীমকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু জনতা অনেক বেশি থাকায় নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি।”
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শামীম রেজার মৃত্যু হয়েছে। তাঁর সঙ্গে আহত আরও দুজনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে; তারা আশঙ্কামুক্ত।
পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। নিহতের পরিবার হত্যামামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, শামীম রেজা আগে থেকেই বিতর্কিত ছিলেন। ২০২১ সালে এক শিশুর মরদেহ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দাফনের ভিডিও ভাইরাল হলে তিনি আলোচনায় আসেন। পরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং তিন মাস কারাভোগের পর তিনি মুক্তি পান।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। বিজিবি টহলও জোরদার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানিয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, “কেউ অপরাধ করলে তার বিচার প্রশাসন করবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।”
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘মব সহিংসতা’ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে এমন ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।