ভেজাল আজ দেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে ওষুধ, প্রসাধনী, এমনকি শিশুখাদ্যেও ভেজালের উপস্থিতি উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের মুনাফালোভী মানসিকতার কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও সচেতনতা ও কার্যকর আইনি প্রয়োগের ঘাটতিতে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
বর্তমানে বাজারে এমন অনেক খাদ্যপণ্য পাওয়া যায়, যেগুলোতে ক্ষতিকর রাসায়নিক, রং বা নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলমূল দ্রুত পাকাতে কার্বাইড, মাছ ও মাংস সংরক্ষণে ফরমালিন, মসলায় কৃত্রিম রং এবং দুধে ক্ষতিকর উপাদান মেশানোর মতো ঘটনা প্রায়ই প্রকাশ পাচ্ছে। এসব ভেজাল খাদ্য মানুষের শরীরে ধীরে ধীরে নানা জটিল রোগ সৃষ্টি করছে। ক্যানসার, কিডনি রোগ, লিভারের সমস্যা ও হৃদরোগ বৃদ্ধির পেছনে ভেজাল খাদ্যের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
শুধু খাদ্য নয়, নকল ও ভেজাল ওষুধও মানুষের জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে। অনেক সময় ভেজাল ওষুধ সেবনে রোগ কমার পরিবর্তে আরও জটিল আকার ধারণ করে। একইভাবে নিম্নমানের প্রসাধনী ব্যবহারেও ত্বক ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে। অথচ এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নয়।
ভেজাল রোধে দেশে আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারে না। অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি অংশ জরিমানাকে ব্যবসার খরচ হিসেবেই ধরে নেয়। ফলে অভিযান শেষ হলে আবারও একই অনিয়ম শুরু হয়। তাই শুধু জরিমানা নয়, গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য বিভাগ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। নিয়মিত বাজার তদারকি, ল্যাব পরীক্ষার ব্যবস্থা বৃদ্ধি এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় কম দামে পণ্য কেনার প্রবণতা বা পণ্যের মান যাচাই না করেই কেনাকাটার কারণে ভেজাল ব্যবসায়ীরা সুযোগ পায়। তাই ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে এবং কোনো অনিয়ম দেখলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
নিরাপদ খাদ্য ও পণ্যের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সুস্থ জাতি গঠনে ভেজালমুক্ত বাজার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। এজন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ, প্রশাসনিক তৎপরতা এবং জনসচেতনতা এই তিনটির সমন্বিত উদ্যোগই পারে ভেজালের ভয়াবহতা কমাতে।
লেখক : আ খম হুসাইন