সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের প্রত্যাশা নতুন কিছু নয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নানা সংকটের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসে। জনগণের বড় একটি প্রত্যাশা ছিল—নতুন সরকার দ্রুত আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ-গ্যাস, কর্মসংস্থান, প্রশাসন ও দুর্নীতির মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনবে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার ছয় মাসের মাথায় এসে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম ১৮০ দিনের বিভিন্ন উদ্যোগ ও অর্জনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি, খাদ্য মজুত, ফ্যামিলি কার্ডসহ কয়েকটি কর্মসূচিকে সরকার ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছে। প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের প্রতিনিধিরাও বারবার বলেছেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ চলছে।
কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্য শুধু ঘোষণা বা কর্মসূচির সংখ্যায় মাপা যায় না। সাধারণ মানুষের জীবনে সেই উদ্যোগের বাস্তব প্রভাব কতটা পড়ছে সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
অর্থনীতির দিকে তাকালে উদ্বেগের জায়গা রয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে ৩১টি অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যে ১৯টির অবনতি এবং ১২টির উন্নতির কথা বলা হয়েছে। অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যও সরকারের প্রথম ছয় মাসে অগ্রগতির তুলনায় উদ্বেগ বেশি দেখেছেন।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো সাধারণ মানুষের অন্যতম বড় সমস্যা। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান তৈরি এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর ফল জনগণ প্রত্যাশা করছে।
জ্বালানি সংকটও সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে মানুষের পাশাপাশি শিল্প ও ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে জ্বালানি সংকট, প্রশাসনিক ধীরগতি এবং বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও সরকারের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম মাপকাঠি। একটি গণতান্ত্রিক সরকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে উন্নয়ন বা অন্যান্য সাফল্যের গল্প অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। সরকারের প্রথম ছয় মাসের মূল্যায়নে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষকদের উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
প্রশাসনেও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হচ্ছে কি না এ প্রশ্ন উঠছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণ বন্ধ হবে, প্রতিষ্ঠানগুলো আরও নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক হবে এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক নিয়োগ, প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা ও সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়ে সমালোচনা সরকারের জন্য সতর্কবার্তা হওয়া উচিত।
তবে মাত্র ছয় মাসের কার্যক্রম দেখে সরকারকে ‘চরম ব্যর্থ’ বলে চূড়ান্ত রায় দেওয়াও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। নতুন সরকার এমন একটি অর্থনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামো পেয়েছে, যেখানে বহু সমস্যা আগে থেকেই জমে ছিল। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগের স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো সমস্যাগুলো রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। কিছু অর্থনৈতিক সূচকে উন্নতির লক্ষণও দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু এখানেই সরকারের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ। জনগণ অসীম সময় অপেক্ষা করতে রাজি নয়। নির্বাচনের আগে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এখন তার বাস্তবায়নের হিসাব দেওয়ার সময় এসেছে। জনগণ জানতে চায় কবে দ্রব্যমূল্য কমবে? কবে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট স্থায়ীভাবে কমবে? কবে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে? কবে প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে? কবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে মানুষ স্বস্তি পাবে?
সরকারের সমালোচনা গণতন্ত্রের দুর্বলতা নয়; বরং গণতন্ত্রের শক্তি। বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও সাধারণ নাগরিকের প্রশ্নের জবাব দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। একইভাবে সরকারের অর্জন থাকলে সেগুলোর স্বীকৃতিও দিতে হবে।
আজকের বাস্তবতায় তাই বিএনপি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আত্মতুষ্টি নয়, আত্মসমালোচনা। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ধরে রাখার চেয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা বেশি জরুরি।
সরকার ব্যর্থ কি না, তার চূড়ান্ত বিচার করবে জনগণ। কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার লক্ষণ দেখা দিলে সরকারকে তা স্বীকার করে দ্রুত সংশোধনের পথে হাঁটতে হবে। ক্ষমতা কোনো পুরস্কার নয়; এটি জনগণের দেওয়া দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্বের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো সাধারণ মানুষ তার জীবনে কতটা পরিবর্তন অনুভব করছে।