মহাবিশ্বের অজানা জগত নিয়ে বিজ্ঞানীদের বিস্ময়ের শেষ নেই। এবার James Webb Space Telescope-এর পর্যবেক্ষণে এমন এক বহিঃগ্রহের সন্ধান মিলেছে, যা এর আগে দেখা কোনো গ্রহের সঙ্গেই মেলে না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে অদ্ভুত এক্সোপ্ল্যানেটগুলোর একটি।
নতুন এই গ্রহটির নাম PSR J2322-2650b। সাধারণ গোলাকার গ্রহের মতো নয়, এর আকৃতি অনেকটা লেবু বা আমেরিকান ফুটবলের মতো ডিম্বাকার। শুধু তাই নয়, এর বায়ুমণ্ডলের গঠনও বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে।
গ্রহটি একটি মৃত নক্ষত্র বা পালসারকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এই পালসার মহাকাশে তীব্র বিকিরণ ছুড়ে দেয়, অনেকটা মহাজাগতিক বাতিঘরের মতো। এমন পালসার ধীরে ধীরে তার সঙ্গী জ্যোতিষ্ককে ক্ষয় করে ফেলে বলেই এ ধরনের ব্যবস্থাকে বিজ্ঞানীরা “ব্ল্যাক উইডো পালসার সিস্টেম” নামে অভিহিত করেন।
যদিও পালসারকে কেন্দ্র করে গ্রহ আবিষ্কার নতুন নয়, তবে পিএসআর জে২৩২২-২৬৫০বি-কে আলাদা করেছে এর অস্বাভাবিক রাসায়নিক গঠন। গবেষকদের মতে, এই গ্রহের বায়ুমণ্ডলে পানি, মিথেন বা কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রায় অনুপস্থিত। বরং সেখানে আধিপত্য করছে বিশুদ্ধ কার্বন ও হিলিয়াম।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, বায়ুমণ্ডলে কার্বনের কণা জমে কালো ধোঁয়ার মতো মেঘ তৈরি করে এবং সেখান থেকে হীরার মতো কণাও বৃষ্টি হয়ে ঝরতে পারে।
গ্রহটি তার পালসারের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে—মাত্র ১৬ লাখ কিলোমিটার দূরে। ফলে মাত্র ৮ ঘণ্টাতেই এটি তার নক্ষত্রকে একবার প্রদক্ষিণ সম্পন্ন করে। পালসারের তীব্র মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে গ্রহটির ভেতরে প্রচণ্ড জোয়ার-ভাটার চাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলেই গ্রহটি গোল না হয়ে চ্যাপ্টা ও লম্বাটে আকার ধারণ করেছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
গ্রহটির আরেকটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর ভয়াবহ তাপমাত্রা। এটি “টাইডালি লকড”, অর্থাৎ এর এক পাশ সবসময় পালসারের দিকে মুখ করে থাকে। সেই অংশের তাপমাত্রা প্রায় ২ হাজার ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অন্য পাশ তুলনামূলক ঠান্ডা হলেও সেখানে তাপমাত্রা প্রায় ৬৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এত উচ্চ তাপমাত্রার মধ্যেও কার্বন আলাদা অবস্থায় টিকে রয়েছে, যা বিজ্ঞানীদের মতে ইঙ্গিত দেয় যে গ্রহটির বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন প্রায় অনুপস্থিত। এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা প্রায় ১৫০টি বহিঃগ্রহের কোনোটিতেই এমন বিশুদ্ধ কার্বনভিত্তিক বায়ুমণ্ডল দেখা যায়নি।
Peter Gao বলেন, “ডেটা হাতে পাওয়ার পর আমাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল—এটা আসলে কী?”
অন্যদিকে Michael Zhang মনে করেন, এই গ্রহের রাসায়নিক গঠন প্রচলিত গ্রহ গঠনের সব তত্ত্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
গবেষকদের একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গ্রহটির অভ্যন্তরে কার্বন ও অক্সিজেন ঠান্ডা হয়ে স্ফটিক আকারে জমে গেছে। পরে বিশুদ্ধ কার্বন উপরের স্তরে উঠে এসে হিলিয়ামের সঙ্গে মিশেছে। তবে কীভাবে অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে গেল, তার উত্তর এখনো অজানা।
Roger Romani বলেন, “সব প্রশ্নের উত্তর না জানা থাকাটাই বিজ্ঞানের সৌন্দর্য। এই গ্রহ আমাদের সামনে এক বিশাল রহস্য উন্মোচন করেছে।”
বিজ্ঞানীদের ধারণা, ভবিষ্যতে এই রহস্যময় গ্রহ নিয়ে আরও গবেষণা মহাবিশ্বে গ্রহ গঠন ও মহাজাগতিক রসায়ন সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে নতুনভাবে বদলে দিতে পারে।