1. desherchitrabd@gmail.com : Desher DesherChitra : Desher Chitra
বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৩১ অপরাহ্ন

প্রতিদিন গড়ে ১০টি খুন: সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা কোথায়?

  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬

দেশের চিত্র প্রতিবেদন

দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আবারও সামনে এসেছে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায়। গত কয়েক মাসে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক সংঘাত, মব সহিংসতা ও নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

রংপুরের ওই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ইতোমধ্যে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের আদালতে জবানবন্দির কথাও জানিয়েছে পুলিশ। তবে স্বজন ও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

রংপুরের এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২ হাজার ৭৬টি মামলা হয়েছে। জানুয়ারিতে ২৮৭, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০, জুনে ৩২৬ এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি মামলা হয়েছে।

অর্থাৎ চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। শুধু মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসেই ৯৩৪টি হত্যা মামলা হয়েছে। পুলিশের হিসাবে, মাসে গড়ে প্রায় ৩০০টি হত্যার মামলা হচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলামও বলেছেন, প্রতি মাসে কমবেশি ৩০০টি হত্যার ঘটনা ঘটছে।

হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি মব সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংঘাতও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম সাত মাসে মব সহিংসতায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৭৭ জন।

রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিরোধ, মাদক, পারিবারিক কলহ, জমি ও ব্যবসায়িক বিরোধ এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে অনেক হত্যাকাণ্ডের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, দেশে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতার ঘাটতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশের মধ্যে যে দুর্বলতা ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তার পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা এখনো সম্ভব হয়নি।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর গ্রেপ্তার ও মামলা করার পাশাপাশি অপরাধের কারণগুলো চিহ্নিত করে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় বিরোধ, রাজনৈতিক সংঘাত কিংবা আধিপত্যের দ্বন্দ্ব অনেক সময় সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আগেই প্রশাসনের নজরে আসে। কিন্তু সময়মতো হস্তক্ষেপ না হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ৪০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রায় তিন হাজার মানুষ আহত হয়েছেন এবং নিহত হয়েছেন অন্তত ৭৭ জন।

রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার এবং পদ-পদবি নিয়ে বিরোধ এসব সংঘাতের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা দ্রুত আইনের আওতায় না এলে স্থানীয় পর্যায়ে সহিংসতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, রাজনৈতিক সংঘাত নতুন কোনো বিষয় নয় এবং বর্তমানে তারা রাজনৈতিক চাপমুক্তভাবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে।

তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি যখন সরাসরি জড়িয়ে পড়ছে, তখন সংঘাত ঠেকাতে প্রশাসনের আগাম ভূমিকা কোথায়?

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও সাম্প্রতিক সময়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, বছরের প্রথম সাত মাসেই মব সহিংসতায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। ঢাকায় নিহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম।

কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী সন্দেহ করে আদালতের বাইরে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা আইনের শাসনের জন্য সরাসরি হুমকি। অনেক ক্ষেত্রে গুজব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যকে কেন্দ্র করেও জনতা উত্তেজিত হয়ে পড়ছে।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, মব সহিংসতা বন্ধে শুধু ঘটনার পর মামলা ও গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়। প্রত্যেকটি ঘটনার দ্রুত তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগজনক। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সাম্প্রতিক ছয় মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১১ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে।

ঢাকার মিরপুরে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার কার্যক্রম দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করেছিল। ওই মামলায় ঘটনার ১৯ দিনের মধ্যে নিম্ন আদালতে রায় দেওয়া হয়।

তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সব নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় এমন দ্রুত বিচার দেখা যায় না। অনেক পরিবার মামলা করার পরও দীর্ঘ সময় ধরে বিচারপ্রক্রিয়ার অপেক্ষায় থাকে। ফলে দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি ও সামাজিক সহায়তা দেওয়া জরুরি।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও পুলিশ বলছে, তারা অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে। চুরি, ডাকাতি ও দস্যুতার কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও হত্যাকাণ্ডের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়নি।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ অভিযান দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান, অপরাধপ্রবণ এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, রাজনৈতিক ও স্থানীয় আধিপত্যের সংঘাত চিহ্নিত করা এবং পুলিশের মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

একই সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, হেফাজতে নির্যাতন বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। কারণ জনগণের আস্থা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি হত্যাকাণ্ডের মামলা এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যা নয়; এর পেছনে রয়েছে শত শত পরিবার, যারা স্বজন হারাচ্ছে এবং বিচার ও নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে আছে।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করতে হলে এখন শুধু অপরাধের পর ব্যবস্থা নিলে হবে না। অপরাধের কারণ চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার, রাজনৈতিক ও স্থানীয় সংঘাতের আগাম তথ্য সংগ্রহ, মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং দ্রুত বিচার সবকিছুকে একই সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।

সাধারণ মানুষ এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা ক্ষমতার প্রভাব কোনো ব্যক্তিকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখবে না। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা এবং মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়াই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

Share this Post in Your Social Media

এই ধরনের আরও খবর
Copyright © 2025-2026, সাপ্তাহিক দেশের চিত্র. All rights reserved.
Theme Customized By BreakingNews