1. desherchitrabd@gmail.com : Desher DesherChitra : Desher Chitra
শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৫৪ অপরাহ্ন

মিলাদ-কিয়াম নিয়ে দ্বন্দ্বের অবসান: মতভেদ নয়, প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান

  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬

ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন আমল ও ধর্মীয় রীতি নিয়ে মুসলিম সমাজে যুগে যুগে নানা ধরনের মতপার্থক্য দেখা গেছে। এসব মতপার্থক্যের মধ্যে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজে মিলাদ ও কিয়াম একটি আলোচিত বিষয়। একদল মুসলিম আলেম ও ধর্মপ্রাণ মানুষ মিলাদ মাহফিল ও কিয়ামকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করেন। অন্যদিকে কিছু আলেম ও মুসল্লি এসব আয়োজনের নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি প্রকাশ করেন। ফলে কোথাও কোথাও ধর্মীয় মতভেদ ব্যক্তিগত বিরোধ, মসজিদকেন্দ্রিক উত্তেজনা কিংবা সামাজিক বিভাজনের রূপ নেয়।

প্রশ্ন হলো,একই ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে একটি আমলের পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ কি পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করার কারণ হতে পারে? নাকি মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সহনশীলতা ও সম্মানের সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব?

‘মিলাদ’ বলতে সাধারণভাবে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম, জীবন, চরিত্র, শিক্ষা ও তাঁর প্রতি ভালোবাসা নিয়ে আলোচনা, দরুদ পাঠ, দোয়া ও ধর্মীয় আলোচনা বোঝানো হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে মিলাদ মাহফিলের আয়োজনের ধরনও ভিন্ন হতে পারে।

অন্যদিকে ‘কিয়াম’ শব্দের অর্থ দাঁড়ানো। কিছু মিলাদ মাহফিলে রাসুল (সা.)-এর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ে দাঁড়িয়ে দরুদ ও সালাম পাঠের প্রচলন রয়েছে। আবার কিছু আলেম এভাবে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শনের পদ্ধতিকে শরিয়তসম্মত মনে করেন না এবং এ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন।

অর্থাৎ বিতর্কের একটি বড় অংশ মূলত মিলাদ আয়োজনের বিভিন্ন পদ্ধতি ও কিয়ামের শরয়ি অবস্থান নিয়ে।

ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন ফিকহি ও ধর্মীয় বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য নতুন কোনো বিষয় নয়। নামাজের বিভিন্ন পদ্ধতি, হাত রাখার নিয়ম, আমিন জোরে বা আস্তে বলা, তারাবির রাকাতসহ নানা বিষয়ে মুসলিমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

কিন্তু মতভেদের সঙ্গে শত্রুতা এক বিষয় নয়।

কোনো ব্যক্তি বা আলেম একটি আমলকে গ্রহণযোগ্য মনে না করলে তিনি নিজে তা পালন না করতে পারেন এবং যুক্তি ও দলিলের মাধ্যমে নিজের মত তুলে ধরতে পারেন। একইভাবে অন্য একজন আলেম বা মুসল্লি কোনো আমলকে বৈধ বা প্রশংসনীয় মনে করলে তিনিও তার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারেন।

সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন মতভেদ ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান, হুমকি কিংবা সামাজিক বিভাজনে পরিণত হয়।

স্থানীয় পর্যায়ে অনেক সময় ধর্মীয় কোনো বিষয় নিয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান বা পারস্পরিক আলোচনার সুযোগ না থাকায় ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও কখনো কখনো উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে। একটি বক্তব্যের ছোট অংশ ছড়িয়ে পড়তে পারে হাজার মানুষের কাছে, যার ফলে সম্পূর্ণ বক্তব্যের পরিবর্তে খণ্ডিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মানুষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।

কখনো আবার রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধের সঙ্গে ধর্মীয় মতভেদ মিশে যায়। তখন একটি ধর্মীয় আমল নিয়ে আলোচনা ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে রূপ নেয়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মুসল্লি এবং স্থানীয় ধর্মীয় পরিবেশ।

মসজিদ মুসলমানদের ঐক্য ও ইবাদতের স্থান। সেখানে নামাজ আদায়কারী মুসল্লিদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতপার্থক্যের কারণে মসজিদে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া বা মুসল্লিদের একে অপরকে অপমান করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

একজন মুসল্লি মিলাদে অংশ নেন কি না, কিয়ামে দাঁড়ান কি না এটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু এর কারণে তাকে হেয় করা বা তার ঈমান-আকিদা নিয়ে তাড়াহুড়ো করে কঠোর মন্তব্য করা সামাজিক শান্তির জন্য ক্ষতিকর।

একইভাবে যারা মিলাদ বা কিয়াম পালন করেন না, তাদেরও অপমান বা ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আক্রমণ করা উচিত নয়।

ধর্মীয় মতভেদকে শান্তিপূর্ণ রাখার ক্ষেত্রে আলেমদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষ অনেক সময় আলেমদের বক্তব্যকে পথনির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করেন। তাই কোনো বিষয়ে মত প্রকাশের সময় ভাষা, উপস্থাপন ও পারস্পরিক সম্মানের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

একজন আলেম যদি বলেন, “আমি এই আমলকে শরিয়তসম্মত মনে করি না”—তাহলে তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করছেন।

কিন্তু যদি বলা হয়, “যারা এটি পালন করে তারা সবাই ভ্রান্ত” তাহলে তা সামাজিক বিভাজন বাড়াতে পারে।

অন্য পক্ষের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নিজের মতকে সঠিক মনে করার অধিকার সবার আছে, কিন্তু অন্যের প্রতি অসম্মান দেখানোর অধিকার কারও নেই।

বর্তমান প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় আলোচনা ব্যাপকভাবে অনুসরণ করে। সেখানে যখন মতভেদ যুক্তি ও জ্ঞানের পরিবর্তে গালাগালি বা বিদ্বেষে পরিণত হয়, তখন তরুণদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

ধর্মীয় বিষয়ে তরুণদের উৎসাহিত করতে হলে তাদের সামনে জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা, নির্ভরযোগ্য আলেমদের মতামত এবং ইসলামের বৃহত্তর নৈতিক শিক্ষাগুলো তুলে ধরা প্রয়োজন।

ইসলামের শিক্ষা শুধু মত প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সত্যবাদিতা, ধৈর্য, ভ্রাতৃত্ব, ক্ষমা, ন্যায়বিচার ও উত্তম আচরণও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মিলাদ-কিয়াম নিয়ে বিরোধ কমাতে প্রথম প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান

স্থানীয় মসজিদ, মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের বিষয়ে আলোচনার আয়োজন করা যেতে পারে। সেখানে ভিন্ন মতের আলেমরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরবেন। সাধারণ মুসল্লিরা প্রশ্ন করতে পারবেন এবং বিতর্ককে ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত না করার বিষয়ে সবাই একমত থাকবেন।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ধর্মীয় বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার আগে তার সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট যাচাই করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, কোনো আমল নিয়ে মতভেদ থাকলে তা নিয়ে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা যেতে পারে।

চতুর্থত, মসজিদ পরিচালনা কমিটিগুলোর উচিত ধর্মীয় মতভেদের কারণে যেন মসজিদের পরিবেশ নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে পরিষ্কার নীতি তৈরি করা।

মিলাদ ও কিয়াম নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। ধর্মীয় বিষয়ে দলিল, ব্যাখ্যা ও ফিকহি মতের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা জ্ঞানচর্চার অংশ হতে পারে। কিন্তু সেই মতভেদ যদি মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করে, তাহলে বিষয়টি নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।

একজন মুসলমান অন্য একজন মুসলমানের সঙ্গে সব বিষয়ে একমত নাও হতে পারেন। কিন্তু তাই বলে তাকে শত্রু ভাবার প্রয়োজন নেই।

বরং মতপার্থক্যের মধ্যেও সহাবস্থান করা একটি পরিণত সমাজের লক্ষণ।

মিলাদ-কিয়াম নিয়ে বিতর্কের বাইরে মুসলমানদের মধ্যে এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যেখানে ঐক্যের প্রয়োজন আরও বেশি—দারিদ্র্য দূর করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মাদক ও অপরাধ প্রতিরোধ, শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের প্রতি মানবিক আচরণ।

এসব বড় সামাজিক সমস্যার সামনে দাঁড়িয়ে একটি আমলের পদ্ধতি নিয়ে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণকর নয়।

ধর্মীয় মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু সেই পার্থক্য যেন ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক শান্তিকে ধ্বংস না করে—এটাই হওয়া উচিত সবার লক্ষ্য।

মিলাদ-কিয়াম পালন করা উচিত কি না, কিয়ামের নির্দিষ্ট পদ্ধতি কতটা গ্রহণযোগ্য এসব বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে। একজন সাধারণ মুসল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্ভরযোগ্য আলেমদের কাছ থেকে জ্ঞান নেওয়া এবং নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী আমল করা।

কিন্তু মতভেদের কারণে অন্য মুসলমানকে অপমান, হেয় বা শত্রু মনে করা কোনো সুস্থ ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশের লক্ষণ নয়।

মত আলাদা হতে পারে, কিন্তু সম্পর্ক নষ্ট হওয়া জরুরি নয়।

মিলাদ-কিয়াম নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসানের সবচেয়ে বাস্তব পথ হয়তো কোনো পক্ষকে জোর করে জয়ী করা নয়; বরং জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা, পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্বের বৃহত্তর স্বার্থকে সামনে রাখা।

ধর্মীয় মতভেদকে যদি সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনার মধ্যে রাখা যায়, তাহলে মতের পার্থক্য বিভাজনের কারণ না হয়ে জ্ঞানচর্চার সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। আর সেই পথেই তৈরি হতে পারে এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষ নিজের বিশ্বাস পালন করার পাশাপাশি অন্যের মতের প্রতিও সম্মান দেখায়।

Share this Post in Your Social Media

এই ধরনের আরও খবর
Copyright © 2025-2026, সাপ্তাহিক দেশের চিত্র. All rights reserved.
Theme Customized By BreakingNews