দেশে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একই সঙ্গে নিরপরাধ কাউকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোও সমানভাবে অন্যায় ও ভয়ংকর। সাম্প্রতিক কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে আলেম ওলামাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যে কিছু ঘটনায় তদন্ত শুরুর আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হয়েছে, আবার কিছু ঘটনায় পরে অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে আসলেই কি কিছু কুচক্রী মহল পরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের টার্গেট করছে?
সম্প্রতি কয়েকটি আলোচিত ঘটনায় দেখা গেছে, কোনো অভিযোগ ওঠার পরই অভিযুক্ত আলেমকে সামাজিকভাবে হেয় করার প্রবণতা তৈরি হয়। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই তাকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ পরে অনেক ক্ষেত্রে তদন্তে নতুন তথ্য সামনে আসে, সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে কিংবা মামলার পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ, জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব অথবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের বিষয় আলোচনায় আসে।
বিশেষ করে গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় কয়েকজন মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে ঘিরে যেসব ঘটনা আলোচনায় এসেছে, সেগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভক্তি তৈরি হয়েছে। কেউ বলছেন, অপরাধ করলে আলেম হলেও ছাড় দেওয়া উচিত নয়। আবার অন্য একটি অংশের দাবি, ধর্মীয় পরিচয়কে টার্গেট করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারও চলছে। বাস্তবতা হলো দুই দিকই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
একটি বিষয় স্পষ্ট, কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠলেই সেটিকে রাজনৈতিক বা আদর্শিক লড়াইয়ের হাতিয়ার বানানো উচিত নয়। কারণ এতে বিচারব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রকৃত অপরাধী আড়াল হওয়ার সুযোগ পায়, আবার নির্দোষ কেউ হয়রানির শিকার হলে তার সামাজিক সম্মানও ধ্বংস হয়ে যায়। একজন আলেমের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু একজন ব্যক্তি নন, একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট পরিবারও চরম ক্ষতির মুখে পড়ে।
এখানে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে। যাচাই ছাড়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা আবেগতাড়িত প্রচারণা সমাজে বিভ্রান্তি বাড়ায়। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে অপরাধী বা নির্দোষ ঘোষণা করা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, ধর্ষণের অভিযোগকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রকৃত ভুক্তভোগীরা যাতে ন্যায়বিচার পান, সে বিষয়েও রাষ্ট্রকে কঠোর থাকতে হবে। তাই প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্যভিত্তিক বিচার এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করেছে, সমাজে এখন সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের আগেই বিভাজন তৈরি হচ্ছে। কেউ অন্ধ সমর্থন করছেন, কেউ আবার অভিযোগ উঠলেই চূড়ান্ত রায় দিয়ে দিচ্ছেন। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে যে অপরাধী, তাকে শাস্তির আওতায় আনা; আর কেউ যদি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে কাউকে ফাঁসানোর চেষ্টা করে, তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। ন্যায়বিচার তখনই নিশ্চিত হবে, যখন আইনের চোখে সবাই সমান হবে এবং বিচার হবে কেবল সত্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে।