দেশ পরিচালনা কোনো সহজ কাজ নয়। একটি রাষ্ট্র তখনই সঠিক পথে এগিয়ে যায়, যখন সেখানে আইনের শাসন কার্যকর থাকে, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশে খুন, রাহাজানি, ছিনতাই ও নানা ধরনের অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মানুষ আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব আরও কঠোর ও কার্যকর হওয়া জরুরি।
রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ আশা করে, তিনি দৃঢ় নেতৃত্বের মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনবেন। শুধু বক্তব্য বা আশ্বাস নয়, বাস্তব পদক্ষেপই এখন সময়ের দাবি। অপরাধী যেই হোক, যে দলেরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে কেউ যেন পার পেয়ে না যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ যখন জনগণ দেখে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যাচ্ছে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের কিছু অসাধু ও সুবিধাবাদী লোক যদি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, তবে তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি চাঁদাবাজি, দখলবাজি কিংবা দুর্নীতির মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এতে শুধু সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ে। তাই দলের ভেতরের দুর্নীতিবাজ ও দুষ্টচক্রকে চিহ্নিত করে সরিয়ে দেওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও আরও সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। অপরাধ দমনে শুধু অভিযান চালালেই হবে না, অপরাধের মূল কারণগুলোও খুঁজে বের করতে হবে। বেকারত্ব, মাদক, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও সামাজিক অবক্ষয় এসব বিষয় অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তাই সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার গতি বাড়ানো প্রয়োজন। দেশে বহু মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, ফলে অপরাধীরা শাস্তির ভয় হারিয়ে ফেলে। দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরাধ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। মানুষ তখনই আইন মানতে আগ্রহী হয়, যখন তারা দেখে অপরাধের যথাযথ বিচার হচ্ছে।
তবে কঠোরতা মানেই অমানবিকতা নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় দৃঢ়তা প্রয়োজন, কিন্তু সেই দৃঢ়তা হতে হবে ন্যায়বিচারভিত্তিক। আইন প্রয়োগের নামে যেন নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শক্ত হাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আজ দেশের মানুষ শান্তি ও নিরাপত্তা চায়। তারা এমন একটি পরিবেশ প্রত্যাশা করে, যেখানে রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমানো যাবে, রাস্তায় নিরাপদে চলাফেরা করা যাবে এবং অপরাধীরা আইনের বাইরে থাকতে পারবে না। এই প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারলেই কেবল দেশে স্থিতিশীলতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।