1. desherchitrabd@gmail.com : Desher DesherChitra : Desher Chitra
রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৭ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
নাইজেরিয়ায় সেনা অভিযানে ৩০০-এর বেশি সশস্ত্র ডাকাত ও অপহরণকারী নিহত আইএইচএস জেনসের সূচকে ছাত্রশিবিরকে বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক সক্রিয় অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ রয়টার্সকে শেখ হাসিনা: ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানালেন মাদ্রাসাগুলো কি জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্র? স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও কেন উগ্রবাদের ফাঁদে পড়ছে Al-Qaeda and ISIS: Misusing Islam, Violence, and the Spread of Extremism A Research-Based Analysis পৃথিবীর দুর্ধর্ষ জঙ্গি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট সকল ধর্মের আলোকে জঙ্গিবাদ: ধর্ম নয়, অপব্যাখ্যাই সহিংসতার মূল উৎস জঙ্গিবাদ: রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবতার জন্য এক অভিন্ন হুমকি এখনো সক্রিয় ২০ জঙ্গি সংগঠন, জামিন নিয়ে পলাতক অনেক সদস্য মার্শাল আর্টের আড়ালে উগ্রবাদের বিস্তার: গোয়েন্দা জালে ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’

পৃথিবীর দুর্ধর্ষ জঙ্গি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

বিশেষ প্রতিবেদন

বিশ্বজুড়ে জঙ্গিবাদ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মতাদর্শ, রাজনৈতিক লক্ষ্য, জাতিগত পরিচয় কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে বহু সশস্ত্র উগ্রবাদী সংগঠনের উত্থান ঘটেছে। তবে গবেষকদের মতে, এসব সংগঠনের কর্মকাণ্ডকে কোনো ধর্মের মূল শিক্ষার প্রতিনিধিত্ব হিসেবে দেখা উচিত নয়। বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলো শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিলেও কিছু গোষ্ঠী ধর্ম বা মতাদর্শের অপব্যাখ্যা ব্যবহার করে সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

বর্তমান বিশ্বে আলোচিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে আইএস (Islamic State/ISIS) অন্যতম। ২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে তারা তথাকথিত খিলাফতঘোষণা করে। সংগঠনটি গণহত্যা, আত্মঘাতী হামলা, অপহরণ, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে সদস্য সংগ্রহের জন্য কুখ্যাত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামরিক অভিযানের ফলে তাদের ভূখণ্ডভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়লেও আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের সহযোগী শাখাগুলো এখনও সক্রিয় রয়েছে।

আলকায়েদা বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক। ১৯৮০এর দশকের শেষ দিকে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত হামলার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীকালে ইয়েমেন, উত্তর আফ্রিকা, সোমালিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ায় এর বিভিন্ন আঞ্চলিক শাখা গড়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মতে, আলকায়েদা দীর্ঘদিন ধরে বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোয় বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তান অঞ্চলে তেহরিকতালেবান পাকিস্তান (TTP) একটি গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গি সংগঠন হিসেবে পরিচিত। এই সংগঠনটি পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী, সরকারি স্থাপনা এবং বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে বহু হামলার দায় স্বীকার করেছে। পাকিস্তানের বিভিন্ন সামরিক অভিযানের পর সংগঠনটির কার্যক্রম সীমিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও কিছু অঞ্চলে তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

লস্করতৈয়বা (Lashkar-e-Taiba) দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে আলোচিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর একটি। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, সংগঠনটি কাশ্মীর অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংগঠনটির নাম ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই সংগঠনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

জইশমোহাম্মদ (Jaish-e-Mohammed)-ও দক্ষিণ এশিয়ার আরেকটি কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠন। ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থার অভিযোগ অনুযায়ী, কাশ্মীর অঞ্চলে সংঘটিত একাধিক বড় হামলার সঙ্গে সংগঠনটির নাম যুক্ত হয়েছে। ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংগঠনটি নতুন করে আলোচনায় আসে এবং এর বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ জোরদার হয়।

ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিল ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (ULFA)। এটি মূলত বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হলেও বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র হামলা, অপহরণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে। পরবর্তীকালে সংগঠনটির একটি অংশ শান্তি আলোচনায় অংশ নিলেও অন্য অংশ সশস্ত্র কার্যক্রম অব্যাহত রাখে।

দক্ষিণ এশিয়ায় আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংগঠন হলো হরকতউলজিহাদআলইসলামী (HuJI)। আফগান যুদ্ধপরবর্তী সময়ে এর উত্থান ঘটে এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন তদন্তে এর সদস্যদের বিরুদ্ধে সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (JMB) সবচেয়ে আলোচিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর একটি। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে সংগঠনটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি লাভ করে। এরপর বাংলাদেশ সরকার ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করে সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার ও বিচার সম্পন্ন করে। নিরাপত্তা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের ফলে সংগঠনটির সাংগঠনিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়, যদিও বিভিন্ন সময়ে এর নতুন শাখা বা ভিন্ন নামে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা দেখা গেছে।

বাংলাদেশে আরেকটি আলোচিত সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (ABT) বা আনসার আলইসলাম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটি অনলাইন প্রচারণা, উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচার এবং ব্লগার, লেখক ও মুক্তচিন্তার ব্যক্তিদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের ফলে তাদের কার্যক্রমও উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়েছে।

পাকিস্তানে সিপাহসাহাবা পাকিস্তান (SSP) এবং এর ভাঙন থেকে গড়ে ওঠা লস্করঝাংভি (LeJ) সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জন্য পরিচিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে বোকো হারাম (নাইজেরিয়া) এবং আলশাবাব (সোমালিয়া) আফ্রিকার দুটি কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠন। বোকো হারাম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রাম ও বেসামরিক জনগণের ওপর হামলার জন্য পরিচিত, অন্যদিকে আলশাবাব সোমালিয়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বহু সন্ত্রাসী হামলার দায় স্বীকার করেছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সহিংস উগ্রবাদ কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসে রাজনৈতিক, জাতিগত ও বর্ণবাদী চরমপন্থী সংগঠনও ব্যাপক সহিংসতা চালিয়েছে। যেমন, জাপানের আউম শিনরিকিয়ো ১৯৯৫ সালে টোকিও মেট্রোতে সারিন গ্যাস হামলা চালায়। একইভাবে বিভিন্ন দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদী ও বর্ণবাদী সংগঠনও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সংগঠনের উত্থানের পেছনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থা, সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, পরিচয় সংকট এবং অনলাইন উগ্রবাদী প্রচারণাসহ একাধিক কারণ কাজ করে। আধুনিক প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের প্রচারণা, অর্থ সংগ্রহ এবং সদস্য নিয়োগকে আরও সহজ করেছে। তবে একই সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশ উগ্রবাদ প্রতিরোধ, গোয়েন্দা নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও জোরদার করেছে।

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান তিন দেশই গত দুই দশকে জঙ্গিবাদ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা, ধর্মীয় নেতাদের ইতিবাচক ভূমিকা এবং অনলাইন উগ্রবাদ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমও গুরুত্ব পাচ্ছে। গবেষকদের মতে, শুধু সামরিক বা আইনগত পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদে মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাই উগ্রবাদ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর পথ।

সবশেষে বলা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় জঙ্গি সংগঠনগুলোর মতাদর্শ, লক্ষ্য ও কার্যপদ্ধতিতে পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় অভিন্ন তারা সহিংসতার মাধ্যমে নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। কিন্তু এসব কর্মকাণ্ড কোনো ধর্ম, জাতি বা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে না। তাই জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় নিরপেক্ষ গবেষণা, সঠিক তথ্য, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সমাজ গঠনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Share this Post in Your Social Media

এই ধরনের আরও খবর
Copyright © 2025-2026, সাপ্তাহিক দেশের চিত্র. All rights reserved.
Theme Customized By BreakingNews