বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা
বাংলাদেশে ক্রীড়া ও আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণের আড়ালে উগ্রবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের এক নতুন এবং উদ্বেগজনক প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে। সম্প্রতি
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (DMP) এর কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (CTTC) এবং স্থানীয় থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (Fatah Combat System – FCS) নামক একটি কথিত মার্শাল আর্ট সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, এই সংগঠনটি মূলত তরুণদের শারীরিক কসরত ও সেলফ-ডিফেন্স শেখানোর আড়ালে নিষিদ্ধ আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় জঙ্গি মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করছিল। ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে প্রধান প্রশিক্ষকসহ ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এই চাঞ্চল্যকর নেটওয়ার্কের ম্যাপ উন্মোচিত হতে শুরু করেছে।
যাত্রাবাড়ীতে মধ্যরাতের অভিযান ও গ্রেপ্তার
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ৫ জুলাই (২০২৬) রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়া বালুর মাঠ এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। সেখান থেকে উগ্রবাদী কার্যকলাপে লিপ্ত থাকা এবং প্রশিক্ষণের নামে তরুণদের মগজ ধোলাই করার অভিযোগে ছয়জনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের মূল সমন্বয়ক ও প্রধান প্রশিক্ষক শাহ আমানত সাবির। এছাড়া বাকি ৫ জন হলেন— হোসেন তানিম, মো. জুনায়েদ, আতাউল্লাহ শাহ, মো. আবিদুর রহমান এবং মো. বায়েজিদ। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু উগ্রবাদী লিফলেট, ডিজিটাল ডিভাইস এবং মার্শাল আর্টের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে তাদের আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে।
ইসলামী মূল্যবোধের আড়ালে ‘ছদ্মবেশ’
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের কাজের ধরণ প্রচলিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। তারা প্রকাশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও নিজস্ব প্রচারণায় নিজেদের একটি “ইসলামী মূল্যবোধ সম্পন্ন আধুনিক মার্শাল আর্ট একাডেমি” হিসেবে তুলে ধরতো। সাধারণ ধর্মপ্রাণ ও শরীরচর্চায় আগ্রহী তরুণরা সহজেই তাদের এই ফাঁদে পা দিত।
সংগঠনটি ঢাকা, খুলনা, যশোর এবং চাঁদপুর জেলায় তাদের কার্যক্রম বিস্তার করেছিল। বিশেষ করে খুলনার সুতারখালী এবং যশোরের অভয়নগরে তারা গোপনে আস্তানা গেড়েছিল। ঢাকার বসিলা ও যাত্রাবাড়ী এলাকাকে তারা প্রধান ট্রেইনিং হাব হিসেবে ব্যবহার করছিল। প্রাথমিকভাবে তরুণদের ফিটনেস ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখানো হলেও, কয়েক ধাপ পার হওয়ার পর নির্বাচিত তরুণদের আসল উদ্দেশ্য বা ‘জিহাদি’ ভাবধারার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হতো।
আন্ডারগ্রাউন্ড টেলিগ্রাম ও আন্তর্জাতিক কানেকশন
ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্তে দেখা গেছে, ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের মূল চালিকাশক্তি ছিল ইন্টারনেটের ডার্ক ওয়েব এবং আন্ডারগ্রাউন্ড টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলো। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বাছাই করে নির্দিষ্ট কিছু তরুণকে গোপন গ্রুপে যুক্ত করা হতো।
এই গোপন প্ল্যাটফর্মগুলোতে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী আল-কায়েদা, তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (TTP) এবং লশকর-ই-তৈয়বার মতো উগ্রপন্থী সংগঠনের মতাদর্শ প্রচার করা হতো। গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন যে, সংগঠনটি পাকিস্তানের টিটিপির আদলে বাংলাদেশে ‘তেহরিক-ই-তালিবান বাংলাদেশ’ (TTB) নামক একটি নতুন উগ্রবাদী প্ল্যাটফর্ম দাঁড় করানোর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করছিল। পাশাপাশি দেশীয় নিষিদ্ধ সংগঠন ‘আনসার আল ইসলাম’-এর সাথেও এদের কৌশলগত ও আদর্শিক যোগাযোগ ছিল।
‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ ও বৈশ্বিক এজেন্ডা
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এই চক্রটির চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় কথিত ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ বা চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা। ফাতাহ কমব্যাটের প্রধান প্রশিক্ষক শাহ আমানত সাবির তরুণদের মানসিকভাবে এমনভাবে প্রস্তুত করছিল যাতে তারা অস্ত্র চালনা ও শারীরিক সক্ষমতায় দক্ষ হয়ে ওঠে এবং প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্য বা পাকিস্তানের উপজাতীয় অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে যোগ দিতে পারে। শারীরিক কসরতের আড়ালে মূলত এটি ছিল একটি ছদ্মবেশী কমব্যাট ক্যাডার তৈরির কারখানা।
বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
বাংলাদেশে মার্শাল আর্ট বা স্পোর্টস ক্লাবের আড়ালে উগ্রবাদের এই নতুন রূপকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অতীতে কওমি মাদ্রাসা বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের টার্গেট করা হলেও, এখন খেলাধুলা ও ফিটনেস সচেতনতাকে হাতিয়ার করা হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ অভিভাবকরাও সহজে টের পান না যে তাদের সন্তান উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এখন শুধুমাত্র ধর্মীয় লেবাসধারী সংগঠনগুলোর ওপর নজর রাখলেই চলবে না; বরং বিভিন্ন স্পোর্টস একাডেমি, অনলাইন ফিটনেস গ্রুপ এবং ছদ্মবেশী আত্মরক্ষা সেন্টারের নিবন্ধন ও কার্যকলাপেও কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।
পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ ও নজরদারি
ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, রিমান্ডে থাকা সাবির ও তার সহযোগীদের কাছ থেকে এই চক্রের অর্থায়নের উৎস বা ‘ফান্ডিং সোর্স’ খোঁজার চেষ্টা চলছে। তারা দেশের ভেতর থেকে নাকি কোনো প্রবাসী বা বিদেশি এজেন্সির মাধ্যমে অর্থ পাচ্ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া এই একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেওয়া অন্য তরুণদের চিহ্নিত করে আইনি প্রক্রিয়ায় আনার কাজ শুরু হয়েছে।
সরকারের কাউন্টার টেররিজম উইং থেকে দেশবাসীকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, সন্তানদের যেকোনো মার্শাল আর্ট বা প্রশিক্ষণ সেন্টারে ভর্তির আগে সেই প্রতিষ্ঠানের অতীত ইতিহাস এবং ট্রেইনারদের ব্যাকগ্রাউন্ড ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া উচিত। ছদ্মবেশী এই ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’-এর পুরো নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলতে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
Post Views:
22