বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে চলতি বছরের শুরুতে আলোচিত ধর্মীয় বক্তা আলী হাসান উসামার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামিতে সহযোগী সদস্য হিসেবে যোগদান সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অতীতে তার বিরুদ্ধে উগ্রবাদ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ঘটনায় নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত ১৭ জানুয়ারি আলী হাসান উসামা দলের সহযোগী সদস্যপদ গ্রহণ করেন। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম ও কেন্দ্রীয় নেতা এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের উপস্থিতিতে তিনি সদস্য ফরম পূরণ করেন। বিষয়টি দলীয় নেতারাও নিশ্চিত করেন।
তবে উসামাকে ঘিরে বিতর্কের সূত্র অনেক পুরোনো। ২০২১ সালে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এবং র্যাব পৃথকভাবে তার বিরুদ্ধে উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচার, তরুণদের চরমপন্থায় উদ্বুদ্ধ করা এবং নিষিদ্ধ সংগঠন আনসার আল ইসলাম-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগ তোলে। সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছিল, তদন্তে তার বিভিন্ন ডিজিটাল যোগাযোগ, বক্তব্য এবং প্রকাশিত বই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তী বিচারিক নিষ্পত্তির পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
২০২১ সালের মে মাসে সংসদ ভবন এলাকায় কথিত হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া এক সন্দেহভাজনের জিজ্ঞাসাবাদে আলী হাসান উসামার নাম উঠে আসে বলে সিটিটিসি জানিয়েছিল। তদন্তকারী সংস্থার ভাষ্য ছিল, ওই সন্দেহভাজনের বক্তব্য এবং জব্দ করা ডিজিটাল আলামতের ভিত্তিতে উসামাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে এসব অভিযোগ আদালতে কীভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে, সে বিষয়ে প্রকাশ্য তথ্য সীমিত।
র্যাবও একই বছরে এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছিল, বিভিন্ন ধর্মীয় আলোচনা ও ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে কিছু তরুণকে উগ্রবাদী মতাদর্শে প্রভাবিত করার অভিযোগ রয়েছে উসামার বিরুদ্ধে। সংস্থাটির দাবি ছিল, তার বক্তব্য ও কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন নজরদারি চলছিল। তবে উসামা বা তার আইনজীবীদের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের জবাব বিভিন্ন সময়ে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে উগ্রবাদ-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে আলোচিত কোনো ব্যক্তির মূলধারার রাজনৈতিক দলে যোগদান স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তৈরি করে। যদিও কেবল কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী বলা যায় না, তবু রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী ও সদস্য বাছাইয়ে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়টি জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে চলতি বছর নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের প্রকাশ্য মিছিল, কালো পতাকা নিয়ে কর্মসূচি এবং অনলাইন প্রচারণা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করেছে এবং প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে নিষিদ্ধ সংগঠনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। একই সময়ে উগ্রবাদ-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে আলোচিত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ঘটনাও জনআলোচনায় এসেছে। ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে যে কেউ আইন অনুযায়ী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন, যদি তার বিরুদ্ধে আইনগত কোনো অযোগ্যতা কার্যকর না থাকে। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে অতীতে উগ্রবাদ, সহিংসতা বা নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে, তাদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর অতিরিক্ত সতর্কতা প্রত্যাশিত। কারণ এমন সিদ্ধান্ত শুধু একটি দলের ভাবমূর্তিকেই নয়, দেশের নিরাপত্তা ও জনআস্থার প্রশ্নকেও প্রভাবিত করতে পারে।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে উসামার সদস্যপদ নিশ্চিত করা হলেও অতীতের অভিযোগ সম্পর্কে দলটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে আসেনি। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সাম্প্রতিক সময়ে তার বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলার বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি। ফলে তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ অতীতে জঙ্গিবাদ দমনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে উগ্রবাদ সংশ্লিষ্ট অভিযোগে আলোচিত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জনপরিসরে প্রশ্ন উঠছে। এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে স্বচ্ছ তদন্ত, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহিতার ওপর। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত মূল্যায়ন আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া উচিত এ নীতিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।