1. desherchitrabd@gmail.com : Desher DesherChitra : Desher Chitra
রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৮ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
নাইজেরিয়ায় সেনা অভিযানে ৩০০-এর বেশি সশস্ত্র ডাকাত ও অপহরণকারী নিহত আইএইচএস জেনসের সূচকে ছাত্রশিবিরকে বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক সক্রিয় অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ রয়টার্সকে শেখ হাসিনা: ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানালেন মাদ্রাসাগুলো কি জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্র? স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও কেন উগ্রবাদের ফাঁদে পড়ছে Al-Qaeda and ISIS: Misusing Islam, Violence, and the Spread of Extremism A Research-Based Analysis পৃথিবীর দুর্ধর্ষ জঙ্গি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট সকল ধর্মের আলোকে জঙ্গিবাদ: ধর্ম নয়, অপব্যাখ্যাই সহিংসতার মূল উৎস জঙ্গিবাদ: রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবতার জন্য এক অভিন্ন হুমকি এখনো সক্রিয় ২০ জঙ্গি সংগঠন, জামিন নিয়ে পলাতক অনেক সদস্য মার্শাল আর্টের আড়ালে উগ্রবাদের বিস্তার: গোয়েন্দা জালে ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’

সকল ধর্মের আলোকে জঙ্গিবাদ: ধর্ম নয়, অপব্যাখ্যাই সহিংসতার মূল উৎস

  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

দেশের চিত্র প্রতিবেদন

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জঙ্গিবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের ঘটনা বারবার মানবসভ্যতার সামনে এক কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরেছে জঙ্গিবাদের সঙ্গে কি সত্যিই কোনো ধর্মের সম্পর্ক রয়েছে, নাকি এটি ধর্মের অপব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক স্বার্থের ফল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা, ইতিহাস এবং বিভিন্ন ধর্মের মূল শিক্ষার বিশ্লেষণে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে আসে পৃথিবীর কোনো প্রধান ধর্মই নিরপরাধ মানুষ হত্যা, সন্ত্রাস বা ঘৃণাকে সমর্থন করে না।

বরং ইসলাম, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, ইহুদিধর্ম ও শিখধর্মসহ বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলো মানবতা, ন্যায়বিচার, সহনশীলতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। তারপরও ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন ধর্মীয় ভাষা ও প্রতীককে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক বা আদর্শিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। এর ফলেই ধর্ম সম্পর্কে ভুল ধারণা এবং সমাজে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে।

গবেষকদের মতে, জঙ্গিবাদকে কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার বড় একটি অংশ আড়াল হয়ে যায়। সহিংস উগ্রবাদের পেছনে সাধারণত একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, পরিচয় সংকট, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার মিলেই এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা এবং অনলাইন প্রচারণা জঙ্গিবাদ বিস্তারের নতুন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আবেগনির্ভর প্রচারণা, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং বিকৃত ধর্মীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিশেষ করে তরুণদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ধর্মতত্ত্ববিদদের মতে, ধর্মের মূল শিক্ষা এবং ধর্মের নামে সংঘটিত অপরাধকে কখনোই এক করে দেখা উচিত নয়। ইসলামে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়েছে।

হিন্দুধর্মে অহিংসা ও সত্যকে সর্বোচ্চ নৈতিক আদর্শ হিসেবে দেখা হয়।

বৌদ্ধধর্ম করুণা, মৈত্রী ও অহিংস জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়।

খ্রিস্টধর্ম ভালোবাসা, ক্ষমাশীলতা এবং মানবসেবাকে গুরুত্ব দেয়।

ইহুদিধর্ম ন্যায়বিচার ও সামাজিক দায়িত্বের কথা বলে এবং শিখধর্ম সকল মানুষের সমান মর্যাদা ও সেবার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে। অর্থাৎ মৌলিক শিক্ষার দিক থেকে বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলো শান্তি ও মানবতার অভিন্ন বার্তা বহন করে।

তবুও প্রশ্ন থেকে যায় তাহলে জঙ্গিবাদ জন্ম নেয় কীভাবে? গবেষণা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্মের নির্বাচিত অংশ উদ্ধৃত করে, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করে এবং ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার মধ্য দিয়েই উগ্রবাদী মতাদর্শ গড়ে ওঠে। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মতাদর্শকে একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং অনুসারীদের মধ্যে ‘আমরা’ ও ‘তারা’ এই বিভাজন তৈরি করে। সমালোচনামূলক চিন্তাকে নিরুৎসাহিত করা, আবেগকে উসকে দেওয়া এবং ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা তাদের সাধারণ কৌশল।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও গবেষকরা একই ধরনের বাস্তবতার কথা উল্লেখ করেছেন। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের অধিকাংশ মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে সমাজ গড়ে তুললেও বিভিন্ন সময়ে কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের বেকারত্ব, অনলাইনে বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার, সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ উগ্রবাদী প্রচারণার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তবে একই সঙ্গে শিক্ষা, সচেতনতা, আইনের শাসন, দায়িত্বশীল গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় নেতাদের ইতিবাচক ভূমিকা এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদে উগ্রবাদ দমন করা সম্ভব নয়। শিক্ষা, সামাজিক সংলাপ, কর্মসংস্থান, মানবাধিকার রক্ষা এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার ছাড়া স্থায়ী সমাধান আসে না। যুক্তরাজ্য, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কোসহ বিভিন্ন দেশ শিক্ষা ও কমিউনিটি অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়ে উগ্রবাদ প্রতিরোধে ইতিবাচক ফল পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিপফেক প্রযুক্তি এবং অনলাইনে ভুয়া তথ্যের বিস্তার। তাই ডিজিটাল সাক্ষরতা, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি এবং সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব, রাষ্ট্র এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে কোনো ব্যক্তি বিভ্রান্তিকর প্রচারণার শিকার না হয়।

জঙ্গিবাদ কোনো ধর্মের পরিচয় নয়; এটি মানবতা, ন্যায়বিচার এবং শান্তির বিরুদ্ধে একটি সহিংস মতাদর্শ। বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলোর মৌলিক শিক্ষা মানুষকে বিভক্ত নয়, বরং ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানায়। তাই জঙ্গিবাদ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো সঠিক শিক্ষা, গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান, ধর্মের যথার্থ ব্যাখ্যা, আইনের শাসন এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ। একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্য ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই।

Share this Post in Your Social Media

এই ধরনের আরও খবর
Copyright © 2025-2026, সাপ্তাহিক দেশের চিত্র. All rights reserved.
Theme Customized By BreakingNews