আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর্যটন খাতে। ইরানি হামলার জেরে পর্যটক সংখ্যা কমে যাওয়ায় দীর্ঘ ১৮ মাসের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে দুবাইয়ের বিশ্বখ্যাত বিলাসবহুল হোটেল বুর্জ আল আরব।
হোটেলটির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জুমেইরাহ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বহুল প্রতীক্ষিত সংস্কার কাজের অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্যারিসভিত্তিক স্থপতি ট্রিস্টান আউয়ারের নেতৃত্বে ধাপে ধাপে এই সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তবে পুরো সময়জুড়ে হোটেলটি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
এদিকে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে হোটেলের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংস্কার চলাকালে বুর্জ আল আরব বন্ধ থাকবে এবং পূর্বে বুকিং দেওয়া অতিথিদের জন্য পাশের অন্যান্য হোটেলে বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
পালতোলা নৌকার আদলে নির্মিত বুর্জ আল আরব দুবাইয়ের অন্যতম আইকনিক স্থাপনা। বুর্জ খলিফা ও পাম আইল্যান্ডসের মতোই এটি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বিলাসবহুল পর্যটনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতি এই খাতকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
গত মার্চ মাসে ইরানের ড্রোন হামলা প্রতিহত করার সময় আকাশ থেকে পড়ে আসা ধ্বংসাবশেষের আঘাতে হোটেলটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানা গেছে। যদিও জুমেইরাহ তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সরাসরি হামলার বিষয়টি উল্লেখ করেনি, বিশ্লেষকদের মতে চলমান আঞ্চলিক সংঘাতই এই পরিস্থিতির মূল কারণ।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার পর শুরু হওয়া এই উত্তেজনা দ্রুতই বিস্তৃত আকার ধারণ করে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়তে থাকে এবং বিদেশি পর্যটক ও প্রবাসীদের একটি বড় অংশ এলাকা ত্যাগ করতে শুরু করেন। এতে দুবাইয়ের পর্যটন খাত সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়ে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর এক মাসের মধ্যেই দুবাই ও আবুধাবির শেয়ারবাজার থেকে ১২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাজারমূল্য হারিয়ে যায়। পাশাপাশি ১৮ হাজারেরও বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যা ভ্রমণ ও পর্যটন শিল্পে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দুবাই নিজেকে একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ বৈশ্বিক ব্যবসা ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ভাবমূর্তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে পর্যটন, রিয়েল এস্টেট এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল অর্থনৈতিক কাঠামো এখন চাপের মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে, সৌদি আরব ও ওমানের মতো তেলনির্ভর অর্থনীতি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে কিছুটা লাভবান হলেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বহুমুখী অর্থনীতি এই সংকটে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে শত শত ব্যালিস্টিক মিসাইল, ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করেছে। যদিও বেশিরভাগ হামলাই প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে, তবুও ধ্বংসাবশেষের কারণে দুবাই ও আবুধাবির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বুর্জ আল আরবের সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়া শুধু একটি হোটেলের সংস্কার কার্যক্রম নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার প্রভাবের একটি বড় প্রতীক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও এই আইকনিক স্থাপনাটি পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।